মৌসুমী বায়ু কাকে বলে: আমাদের দেশে হুট করে যখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে, কিংবা শীতের শুরুতে যখন উত্তরের ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করে—আপনার কি কখনো জানতে ইচ্ছে করেছে কেন এমন হয়? কেন বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়েই আমাদের আবহাওয়া বদলে যায়? প্রকৃতির এই রহস্যের পেছনে লুকিয়ে আছে একটি বিশেষ বাতাস, যাকে আমরা 'মৌসুমী বায়ু' বলি। কিন্তু এই বায়ু ঠিক কীভাবে কাজ করে? কেনই বা এটি আমাদের দেশের কৃষিকাজ আর বৃষ্টির জন্য এত জরুরি? আর আপনি কি জানেন, এই বায়ুর নাম কেন 'মৌসুমী' রাখা হয়েছে? আজকের এই ব্লগে আমরা মৌসুমী বায়ুর এমন কিছু মজার এবং অজানা তথ্য জানবো, যা আপনার পরীক্ষার জন্য যেমন জরুরি, তেমনি সাধারণ জ্ঞানের জন্যও দারুণ। আপনি যদি খুব সহজে এই বিশাল প্রাকৃতিক পরিবর্তনটি বুঝতে চান, তবে আজকের এই লেখাটি আপনার জন্য। চলুন, গভীরে যাওয়া যাক!
মৌসুমী বায়ু কাকে বলে?
ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে যে বায়ুপ্রবাহের দিক সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয় তাকে মৌসুমী বায়ু বলে।
আরো বিস্তারিত বললে, ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে যে বায়ুর প্রবাহের দিক সম্পূর্ণ বদলে যায়, তাকে মৌসুমী বায়ু বলে। সহজ কথায়, গ্রীষ্মকালে এক দিক থেকে এবং শীতকালে তার ঠিক উল্টো দিক থেকে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, সেটিই হলো মৌসুমী বায়ু।
মৌসুমী শব্দের অর্থ ও উৎপত্তি
মৌসুমী শব্দটি আরবি শব্দ 'মওসুম' থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো 'ঋতু'। আবার অনেকে মনে করেন এটি মালয়ী শব্দ 'মনসিন' থেকে তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বছরের ছয় মাস বায়ু উত্তর-পূর্ব দিক থেকে এবং বাকি ছয় মাস দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে বয়ে যায়। স্থলভাগ ও জলভাগের তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণেই এই বিশেষ বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয়।
মৌসুমী বায়ুর প্রকারভেদ
মৌসুমী বায়ুকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
- ১. গ্রীষ্মকালীন মৌসুমী বায়ু: এটি গরমকালে সমুদ্র থেকে স্থলের দিকে বয়ে আসে।
- ২. শীতকালীন মৌসুমী বায়ু: এটি শীতকালে স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে বয়ে যায়।
গ্রীষ্মকালীন মৌসুমী বায়ু ও এর প্রভাব
গ্রীষ্মের সময়ে সূর্য যখন উত্তর গোলার্ধে সোজাসুজিভাবে আলো দেয়, তখন এশিয়ার বিশাল স্থলভাগ দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড গরমের কারণে ওই এলাকার বাতাস হালকা হয়ে ওপরের দিকে উঠে যায়, যার ফলে সেখানে বাতাসের ঘনত্ব কমে গিয়ে একটি ‘নিম্নচাপ’ অঞ্চলের সৃষ্টি হয়। ঠিক সেই সময়ে সমুদ্রের পানি স্থলভাগের তুলনায় অনেকটা শীতল থাকে বলে সেখানে বাতাসের চাপ বেশি থাকে, যাকে আমরা ‘উচ্চচাপ’ বলি।
নিয়ম অনুযায়ী, বাতাস উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে দৌড়ায়। ফলে সমুদ্রের জলীয়বাষ্পপূর্ণ বাতাস এশিয়ার স্থলভাগের দিকে আসতে থাকে। ফেরেলের সূত্র অনুযায়ী এই বাতাস কিছুটা বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু নামে প্রবাহিত হয়। এই বায়ু পাহাড়ে বাধা পেয়ে প্রচুর বৃষ্টি ঘটায়, যা আমাদের দেশের কৃষিকাজের জন্য খুবই উপকারী।
এই বায়ুর দুটি শাখা রয়েছে:
- আরবসাগরীয় শাখা: এটি আরব সাগর থেকে তৈরি হয়।
- বঙ্গোপসাগরীয় শাখা: এটি বঙ্গোপসাগর থেকে তৈরি হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতে প্রবেশ করে।
শীতকালীন মৌসুমী বায়ু
শীতকালে সূর্য দক্ষিণ গোলার্ধে সরে যায়। ফলে এশিয়ার স্থলভাগ দ্রুত ঠান্ডা হয়ে সেখানে উচ্চচাপ তৈরি হয় এবং সমুদ্রের দিকে নিম্নচাপ থাকে। তখন স্থলভাগ থেকে শুষ্ক ও ঠান্ডা বাতাস সমুদ্রের দিকে বইতে শুরু করে। একে উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু বলে। এই বাতাস যেহেতু স্থল থেকে আসে, তাই এতে পানি বা জলীয়বাষ্প থাকে না বললেই চলে, ফলে শীতকাল সাধারণত শুষ্ক থাকে। তবে এই বায়ু যখন সমুদ্র পার হয় (যেমন জাপান সাগর বা বঙ্গোপসাগর), তখন কিছু জলীয়বাষ্প নিয়ে জাপান বা ভারতের তামিলনাড়ুতে সামান্য বৃষ্টি ঘটায়।
মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলের অবস্থান
মৌসুমী বায়ুর বিস্তৃতি মূলত এশিয়া মহাদেশকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। এশিয়ার বাইরে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াতেও এর উপস্থিতি রয়েছে। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার উত্তর উপকূল, আফ্রিকার গিনি উপকূল এবং আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলেও মৌসুমী জলবায়ুর সদৃশ আবহাওয়া পরিলক্ষিত হয়।
মৌসুমী জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. বৃষ্টিপাত
এই অঞ্চলে বছরের অধিকাংশ বৃষ্টি হয় গ্রীষ্মকালে (প্রায় ১২৫-২০০ সেন্টিমিটার)। শীতকাল থাকে প্রায় বৃষ্টিহীন। ভারতের চেরাপুঞ্জির মৌসিনরাম নামক স্থানে এই বায়ুর প্রভাবেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়।
২. তাপমাত্রা
গ্রীষ্মকালে গড় তাপমাত্রা থাকে ২১° থেকে ৩২° সেলসিয়াস এবং শীতকালে ১০° থেকে ২১° সেলসিয়াস। সমুদ্রের কাছাকাছি এলাকায় তাপমাত্রা খুব বেশি বা খুব কম হয় না, আবহাওয়া আরামদায়ক থাকে।
৩. বায়ুর চাপ ও প্রবাহ
ঋতুভেদে বাতাসের চাপের পরিবর্তন হয়। গ্রীষ্মে স্থলভাগে নিম্নচাপ আর শীতে উচ্চচাপ থাকে। এই চাপের পার্থক্যের কারণেই বাতাস তার দিক পরিবর্তন করে। শীতকালের তুলনায় গ্রীষ্মকালীন বাতাস বেশি শক্তিশালী হয়।
৪. মেঘাচ্ছন্নতা
মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে আকাশে প্রচুর মেঘ দেখা যায়। অনেক সময় মেঘের ঘনত্বের কারণে আবহাওয়া বেশ গুমোট বা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা: বিস্ফোরণ ও বিরাম
মৌসুমী বিস্ফোরণ (Monsoon Burst)
কোনো কোনো বছর জুন মাসের শুরুর দিকে হঠাৎ করে প্রচুর বজ্রসহ প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়, যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। একেই বলা হয় মৌসুমী বিস্ফোরণ। এর ফলে অনেক সময় বন্যা দেখা দেয়।
মৌসুমী বায়ুর ছেদ বা বিরাম (Monsoon Break)
বর্ষাকালে সবসময় টানা বৃষ্টি হয় না। দেখা যায় একটানা বৃষ্টির পর মাঝে ৭ থেকে ১৫ দিন একদম বৃষ্টি হয় না, আকাশ পরিষ্কার থাকে। বৃষ্টির এই সাময়িক বন্ধ থাকাকেই বলা হয় মৌসুমী বায়ুর ছেদ বা বিরাম।
আশা করি, এই আলোচনার মাধ্যমে তোমরা মৌসুমী বায়ু সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছো।
- মৌসুমী বায়ু কাকে বলে class 5
- মৌসুমী বায়ু কাকে বলে class 10
- মৌসুমী বায়ু কাকে বলে class 8
- মৌসুমী বায়ু কাকে বলে class 6
- মৌসুমী বায়ু কাকে বলে class 9
- উত্তর পূর্ব মৌসুমী বায়ু কাকে বলে
- দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমি বায়ু কাকে বলে
- শীতকালীন মৌসুমী বায়ু কাকে বলে