আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজেই ঘর্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাঁটা, লেখা, গাড়ি চালানো—সব কিছুতেই ঘর্ষণ কাজ করে। কিন্তু অনেকেই জানি না, ঘর্ষণ আসলে কীভাবে কাজ করে বা এর কত রকম আছে। এই লেখায় আমরা খুব সহজ ভাষায় জেনে নেব ঘর্ষণ কাকে বলে, এর প্রকারভেদ, সুবিধা, অসুবিধা এবং আরও অনেক দরকারি তথ্য। আশা করি সহজভাবে লেখা এই লেখাটি পড়লে বিষয়টি সবার খুব ভালোভাবে বুঝতে সুবিধা হবে।
ঘর্ষণ কাকে বলে?
সংজ্ঞা: যখন একটি বস্তু অন্য একটি বস্তুর সংস্পর্শে থেকে তার ওপর দিয়ে চলতে চায় বা চলে, তখন তাদের স্পর্শ তলে গতির বিরুদ্ধে একটি বাধা তৈরি হয়। এই বাধাকেই বলা হয় ঘর্ষণ। আর এই বাধা জনিত বলকে বলা হয় ঘর্ষণ বল।
ঘর্ষণ বল যে সকল উপাদানের উপর নির্ভরশীল
- বস্তুর প্রকৃতি ও পদার্থের উপর
- মিলন তলের প্রকৃতি ও স্বভাবের উপর
- মিলন তলের মধ্যবর্তী বায়বীয় পদার্থের উপর
- তাপমাত্রার উপর
ঘর্ষণের প্রকারভেদ
ঘর্ষণ বলকে সাধারণভাবে চার ভাগে ভাগ করা যায়:
- স্থিতি ঘর্ষণ (Static Friction)
- গতীয় ঘর্ষণ (Kinetic Friction)
- আবর্ত ঘর্ষণ (Rolling Friction)
- প্রবাহী ঘর্ষণ (Fluid Friction)
১) আবর্ত ঘর্ষণ কাকে বলে?
যখন একটি বস্তু কোনো তলের উপর দিয়ে গড়িয়ে চলে, তখন যে ঘর্ষণের সৃষ্টি হয়, তাকে আবর্ত ঘর্ষণ বলে।
উদাহরণ: ফুটবল বা মার্বেল যখন মাটির উপর গড়িয়ে চলে, তখন মাটি ও বলের মধ্যে যে ঘর্ষণ হয়, সেটিই আবর্ত ঘর্ষণ।
২) প্রবাহী ঘর্ষণ কাকে বলে?
যখন কোনো বস্তু তরল বা বায়বীয় পদার্থের ভেতর দিয়ে চলে, অথবা কোনো বস্তু স্থির থেকে সেই তরল বা বায়ুর প্রবাহে বাধা দেয়, তখন যে ঘর্ষণের সৃষ্টি হয়, তাকে প্রবাহী ঘর্ষণ বলে।
উদাহরণ: নদীতে নৌকা চলার সময় পানি ও নৌকার মধ্যে যে ঘর্ষণ হয়, সেটি প্রবাহী ঘর্ষণ।
৩) স্থিতি ঘর্ষণ কাকে বলে?
যখন কোনো বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করা হলেও তা স্থির থাকে, অর্থাৎ বস্তুটি নড়ে না, তখন যে ঘর্ষণ বল বস্তুটিকে স্থির রাখে, তাকে স্থিতি ঘর্ষণ বলে।
উদাহরণ: যদি একটি টেবিলের ওপর রাখা বস্তুতে ৫০ নিউটন বল প্রয়োগ করা হয় কিন্তু তা না নড়ে, তাহলে সেই ৫০ নিউটন বলের সমান স্থিতি ঘর্ষণ বল কাজ করছে।
৪) গতীয় ঘর্ষণ কাকে বলে?
যখন কোনো বস্তুকে বল প্রয়োগ করে টানা হলে সেটি চলতে শুরু করে, তখন যে ঘর্ষণ বল কাজ করে, তাকে গতীয় ঘর্ষণ বলে।
উদাহরণ: যদি টেবিলের ওপর রাখা বস্তুতে ৫০ নিউটন বল প্রয়োগ করা হয় এবং বস্তুটি চলতে শুরু করে, তাহলে তখন গতীয় ঘর্ষণ বল কাজ করবে, যা সাধারণত ৫০ নিউটনের চেয়ে কম হবে।
ঘর্ষণের সুবিধা
- গাড়ি থামানো যায়।
- দিয়াশলাই কাঠি জ্বালানো যায়।
- দেয়ালে পেরেক আটকানো যায়।
- সেতারে সুর তোলা সম্ভব হয়।
- রাস্তায় হাঁটা সম্ভব হয়।
- যন্ত্রপাতি ঘুরানো সম্ভব হয়।
- দেয়ালে মই লাগানো যায়।
- হাতে কিছু ধরা যায়।
এই সব কাজ ঘর্ষণ না থাকলে করা সম্ভব হতো না।
ঘর্ষণের অসুবিধা
- মেশিনের যন্ত্রাংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
- গাছের ডালের ঘর্ষণে বনেও আগুন লাগতে পারে।
- ঘর্ষণ গতির বিপরীতে কাজ করে, ফলে গতিশক্তি কমে যায়।
- অপ্রয়োজনীয় তাপ উৎপন্ন হয়, ফলে শক্তির অপচয় ঘটে।
ঘর্ষণ বলের একক
ঘর্ষণ এক ধরনের বল, তাই এর এককও বলের এককের মতোই।
- এস.আই. পদ্ধতিতে একক — নিউটন (Newton)
- সি.জি.এস. পদ্ধতিতে একক — ডাইন (Dyne)
ঘর্ষণ রাশি
ঘর্ষণের মান ও দিক দুটোই থাকে, তাই ঘর্ষণ একটি ভেক্টর রাশি।
স্থিতি ঘর্ষণ ও গতীয় ঘর্ষণের পার্থক্য
| স্থিতি ঘর্ষণ | গতীয় ঘর্ষণ |
|---|---|
| যখন কোনো বস্তু চলার চেষ্টা করে কিন্তু চলতে পারে না, তখন যে ঘর্ষণ বল সৃষ্টি হয় তা হলো স্থিতি ঘর্ষণ। | যখন কোনো বস্তু চলমান থাকে, তখন যে ঘর্ষণ বল কাজ করে, সেটি হলো গতীয় ঘর্ষণ। |
| বাহ্যিক বলের মান সীমাস্থ ঘর্ষণের সমান না হওয়া পর্যন্ত স্থিতি ঘর্ষণের মান বাড়ে। | গতীয় ঘর্ষণের মান চলমান বস্তুর ওপর প্রয়োগিত বলের মানের উপর নির্ভর করে না। |
| স্প্রিং তুলা দ্বারা পরিমাপ করা যায়। | স্প্রিং তুলা দ্বারা সহজে পরিমাপ করা যায় না। |
উপসংহার
ঘর্ষণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি ছাড়া আমরা হাঁটতে, ধরতে, এমনকি কোনো কাজ করতে পারতাম না। তবে ঘর্ষণ অনেক সময় শক্তির অপচয়ও ঘটায়। তাই ঘর্ষণকে আমরা কখনো বন্ধু, আবার কখনো শত্রু বলেও ভাবতে পারি।
এই ধরনের আরও সহজ ও শিক্ষামূলক লেখা পড়তে ভিজিট করুন StudyTika.com 🌿