কিয়ামত কাকে বলে? (সহজ সংজ্ঞা) | কিয়ামতের ভয়াবহতা ও পরকালের ঘটনাবলি

 কল্পনা করুন তো, একদিন হঠাৎ পৃথিবীটা একদম ওলটপালট হয়ে গেল! আকাশ ফেটে যাচ্ছে, পাহাড়গুলো তুলোর মতো উড়ছে, আর চারদিকে শুধু হাহাকার। আমরা সবাই জানি একদিন এই দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে, যাকে আমরা 'কিয়ামত' বলি। কিন্তু আপনি কি জানেন, সেইদিন ঠিক কী কী ঘটবে? কেন পশু-পাখিদেরও বিচার করা হবে? কিংবা অপরাধীরা সেদিন কীভাবে হাঁটবে? আমাদের শরীরের পচে যাওয়া হাড়গুলো কীভাবে আবার জীবিত হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানলে আপনার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে। কিয়ামতের সেই অবিশ্বাস্য এবং শিহরণ জাগানো ঘটনাগুলো সহজভাবে জানতে আজকের এই লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন। এমন কিছু তথ্য আপনি জানতে পারবেন যা হয়তো আগে কখনো এভাবে ভাবেননি।

কিয়ামত কাকে বলে?(সহজ সংজ্ঞা)

কিয়ামত কাকে বলে? কিয়ামতের ভয়াবহতা ও পরকালের ঘটনাবলি

ইসলামি পরিভাষা অনুযায়ী, মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইসরাফিল (আ.)-এর শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়ার মাধ্যমে এই মহাবিশ্ব ধ্বংস হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে বিচার দিবসের জন্য সকল সৃষ্টির পুনরায় জীবিত হয়ে উঠে দাঁড়ানোকে কিয়ামত বলে।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কিয়ামত শব্দের অর্থ হলো 'উঠে দাঁড়ানো'। মহান আল্লাহর নির্দেশে যখন হযরত ইসরাফিল (আ.) শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন, তখন সমস্ত মানুষ তাদের কবর থেকে জীবিত হয়ে উঠে দাঁড়াবে। আল্লাহর সামনে হাজির হওয়ার এই দিনটিকেই কিয়ামত বা বিচার দিবস বলা হয়।

১. কিয়ামত শব্দের অর্থ ও হাশরের ময়দান

কিয়ামত মানে যেমন উঠে দাঁড়ানো, তেমনি পবিত্র কুরআনে 'হাশর' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। হাশর মানে হলো 'একত্রিত করা'। দুনিয়ার সমস্ত মানুষ, জিন এবং অন্যান্য সৃষ্টিকে বিচার করার জন্য এক বিশাল ময়দানে জড়ো করা হবে। একেই হাশরের ময়দান বলা হয়।

২. কিয়ামত কখন হবে?

কিয়ামত ঠিক কত তারিখে বা কত সালে হবে, তা একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা জানেন। তবে নবী করীম (সা.)-এর বিভিন্ন হাদিস থেকে জানা যায় যে, কিয়ামত কোনো এক শুক্রবার সংঘটিত হবে।

৩. কাদের বিচার করা হবে?

মানুষ এবং জিন জাতিকে বিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের ওপর আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মানার দায়িত্ব ছিল। তাই হাশরের ময়দানে তাদের ভালো-মন্দ কাজের হিসাব নেওয়া হবে। এছাড়া ফেরেশতা এবং পশু-পাখিদেরও সেখানে উপস্থিত করা হবে।

৪. পশু-পাখিদের হাশর ও বিচার

অবাক হওয়ার কিছু নেই, পশু-পাখিদেরও সেদিন বিচার হবে। যদি কোনো শিংওয়ালা ছাগল দুনিয়াতে কোনো শিংবিহীন ছাগলকে কষ্ট দিয়ে থাকে, তবে সেদিন সেই শিংহীন ছাগলকে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। ইনসাফ কায়েম করার পর তাদের মাটি বানিয়ে দেওয়া হবে।

৫. কিয়ামতের দিন মানুষের অবস্থা কেমন হবে?

হাদিস অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন মানুষ যখন কবর থেকে উঠবে, তখন তারা থাকবে:

  • খালি পায়ে
  • উলঙ্গ অবস্থায় (পোশাকহীন)
  • খতনা বিহীন অবস্থায়

আয়িশা (রা.) যখন এটি শুনে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, মানুষ কি একে অপরের দিকে তাকাবে না? তখন নবীজি (সা.) বলেছিলেন, সেই দিনের ভয়াবহতা এত বেশি হবে যে, কেউ কারও দিকে তাকানোর সময় পাবে না।

৬. অপরাধী ও কাফেরদের করুণ দশা

যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করত না, তাদের অবস্থা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ:

  • অন্ধ ও বোবা অবস্থা: কাফেরদের অন্ধ, বোবা এবং বধির অবস্থায় হাশরের ময়দানে আনা হবে।
  • মুখের ওপর ভর দিয়ে চলা: তারা পায়ের বদলে মুখের ওপর ভর দিয়ে চলবে। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, মানুষ কি মুখে ভর দিয়ে চলতে পারে? নবীজি (সা.) উত্তর দিয়েছিলেন, যিনি পায়ে হাঁটাতে পারেন, তিনি মুখেও হাঁটাতে পারেন।
  • নীল চক্ষু: অপরাধীদের চোখ নীল ও আতঙ্কিত অবস্থায় থাকবে।

৭. মৃতদেহ কীভাবে জীবিত হবে?

আল্লাহ তায়ালা আকাশ থেকে বিশেষ এক ধরণের বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। সেই বৃষ্টির ফলে মানুষের পচে যাওয়া হাড়গোড় থেকে পুনরায় পূর্ণ দেহ তৈরি হবে, ঠিক যেমন মাটিতে বীজ থেকে চারা গজায়। এরপর ইসরাফিল (আ.)-এর শিঙ্গার ফুঁ দেওয়ার সাথে সাথে আত্মাগুলো দেহে প্রবেশ করবে এবং মানুষ কবর থেকে বেরিয়ে আসবে।

৮. নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের শাস্তি

দুনিয়াতে যারা বিশেষ কিছু অন্যায় করবে, কিয়ামতের দিন তাদের চেনা যাবে তাদের অবস্থা দেখে:

  • ভিক্ষুকদের অবস্থা: যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মানুষের কাছে হাত পাতত, কিয়ামতের দিন তাদের চেহারায় কোনো মাংস থাকবে না, শুধু হাড় থাকবে।
  • অবিচারী স্বামী: যার একাধিক স্ত্রী ছিল কিন্তু সে সবার সাথে সমান ব্যবহার করেনি, সে কিয়ামতের দিন দেহের একপাশ অবশ বা বাঁকা অবস্থায় উপস্থিত হবে।
  • খুনী ও নিহত ব্যক্তি: নিহত ব্যক্তি তার খুনিকে ধরে আল্লাহর সামনে হাজির হবে এবং বিচার চাইবে।
  • যাকাত না দেওয়া ব্যক্তি: যারা যাকাত দিত না, তাদের সম্পদকে বিষধর সাপে পরিণত করে তাদের গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। সেই সাপ তাদের দংশন করতে থাকবে।
  • অসাধু শাসক ও মিথ্যা শপথকারী: যারা অন্যের সম্পদ কেড়ে নেওয়ার জন্য মিথ্যা শপথ করত, তারা আল্লাহর চরম ক্রোধের সম্মুখীন হবে।

উপসংহার

কিয়ামত একটি ধ্রুব সত্য। সেই দিনের কঠিন হিসাব থেকে বাঁচতে হলে আমাদের দুনিয়াতে সৎ পথে চলতে হবে এবং আল্লাহর আদেশগুলো মেনে চলতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

  • কিয়ামত কাকে বলে class 8
  • কিয়ামত কাকে বলে class 6
  • কিয়ামত কাকে বলে class 5
  • কিয়াম কাকে বলে
  • হাশর কাকে বলে
  • কিয়ামত কাকে বলে ব্যাখ্যা কর
  • কিয়ামত কত প্রকার
  • মিজান কাকে বলে
কিয়ামত বা পরকাল কোনো গল্প নয়, বরং এটিই আমাদের শেষ গন্তব্য। সেই কঠিন দিনে আমাদের একমাত্র সম্বল হবে আমাদের ভালো কাজগুলো। আজকের এই লেখা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, দুনিয়ার ছোট একটি অন্যায়ও সেদিন কতোটা ভারী হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই আসুন, আমরা নিজেদের শুধরে নিই এবং আল্লাহর পথে চলার চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই ভয়াবহ দিনের আজাব থেকে রক্ষা করুন। আমিন। বন্ধুরা, আপনাদের এই লেখাটি কেমন লেগেছে তা কমেন্ট করে আমাদের জানাতে পারেন। পরকাল, ইসলাম এবং দৈনন্দিন জীবনের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও অজানা বিষয় জানতে আমাদের ওয়েবসাইট studytika.com-এর অন্যান্য পোস্টগুলো পড়তে ভুলবেন না। আপনার একটি শেয়ার হয়তো অন্য কাউকে সচেতন করতে সাহায্য করবে। আমাদের সাথেই থাকুন!

Getting Info...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.