আসসালামু আলাইকুম! রসায়ন পড়তে গিয়ে আমরা সবাই পর্যায় সারণি বা Periodic Table দেখেছি, তাই না? কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, কেন সোডিয়াম খুব সক্রিয় কিন্তু নিয়ন একদম শান্ত? কিংবা কেন বাম থেকে ডানে গেলে পরমাণুর আকার ছোট হতে থাকে? আসলে পর্যায় সারণির এই মৌলগুলো কোনো এলোমেলো নিয়মে সাজানো নেই। এদের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক দারুণ বিজ্ঞান! আপনি যদি একবার এই 'ম্যাজিক' বা নিয়মগুলো বুঝে যান, তবে রসায়ন আপনার কাছে জলের মতো সহজ মনে হবে। আজকের ব্লগে আমরা পর্যায় সারণির সেই বিশেষ কিছু গোপন ধর্ম বা পর্যায়বৃত্ত ধর্ম নিয়ে আলোচনা করব, যা জানলে আপনি মৌলদের আচার-আচরণ অনায়াসেই বলে দিতে পারবেন। পুরো বিষয়টি পানির মতো সহজ করে বুঝতে আজকের পোস্টটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন। কথা দিচ্ছি, মুখস্থ করার ঝামেলা ছাড়াই আপনি আজ অনেক কিছু শিখতে যাচ্ছেন!
পর্যায়বৃত্ত ধর্ম কাকে বলে?
মৌলের পর্যায়বৃত্ত ধর্ম কী? (Definition)
সহজ কথায় বলতে গেলে, পর্যায় সারণিতে যখন আমরা এক মৌল থেকে অন্য মৌলে যাই, তখন তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বারবার ফিরে আসে। পারমাণবিক সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে মৌলগুলোর ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মের এই যে নিয়মিত পরিবর্তন বা পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাকেই পর্যায়বৃত্ত ধর্ম বা Periodic Trends বলে।
এই ধর্মগুলো কেন পরিবর্তিত হয়?
মৌলগুলোর ইলেকট্রন বিন্যাসের কারণেই মূলত এই পরিবর্তন ঘটে। পারমাণবিক সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে যখন ইলেকট্রন বিন্যাস এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যায় বা একই স্তরে ইলেকট্রন সংখ্যা বাড়ে, তখনই এই ধর্মগুলো নিয়মিত বিরতিতে আবর্তিত হয়।
প্রধান পর্যায়বৃত্ত ধর্মসমূহ ও তাদের পরিবর্তন
নিচে ৫টি প্রধান পর্যায়বৃত্ত ধর্ম এবং সেগুলো পর্যায় সারণিতে কীভাবে কাজ করে তা সহজভাবে দেওয়া হলো:
১. পারমাণবিক ব্যাসার্ধ (পরমাণুর আকার)
- একই পর্যায়ে (বাম থেকে ডানে): আপনি যখন পর্যায় সারণির বাম দিক থেকে ডান দিকে যাবেন, তখন পরমাণুর আকার ছোট হতে থাকে।
- একই গ্রুপে (উপর থেকে নিচে): ওপর থেকে নিচে নামলে নতুন নতুন ইলেকট্রন স্তর যুক্ত হয়, তাই পরমাণুর আকার বড় হতে থাকে।
২. আয়নিকরণ শক্তি
গ্যাসের অবস্থা থেকে একটি পরমাণু থেকে ইলেকট্রন সরিয়ে নিতে যে শক্তির প্রয়োজন হয় তাকে আয়নিকরণ শক্তি বলে।
- একই পর্যায়ে (বাম থেকে ডানে): বাম থেকে ডানে গেলে আয়নিকরণ শক্তি বাড়ে।
- একই গ্রুপে (উপর থেকে নিচে): ওপর থেকে নিচে নামলে আয়নিকরণ শক্তি কমে।
৩. ইলেকট্রন আসক্তি
একটি পরমাণু যখন ইলেকট্রন গ্রহণ করে শক্তি নির্গত করে, তাকে ইলেকট্রন আসক্তি বলে।
- একই পর্যায়ে (বাম থেকে ডানে): বাম থেকে ডানে গেলে ইলেকট্রন আসক্তি বাড়ে।
- একই গ্রুপে (উপর থেকে নিচে): ওপর থেকে নিচে নামলে ইলেকট্রন আসক্তি কমে।
৪. তড়িৎ ঋণাত্মকতা
অন্য কোনো পরমাণুর সাথে যুক্ত থাকা অবস্থায় ইলেকট্রনকে নিজের দিকে টেনে নেওয়ার ক্ষমতাকে তড়িৎ ঋণাত্মকতা বলে।
- একই পর্যায়ে (বাম থেকে ডানে): বাম থেকে ডানে গেলে তড়িৎ ঋণাত্মকতা বাড়ে।
- একই গ্রুপে (উপর থেকে নিচে): ওপর থেকে নিচে নামলে তড়িৎ ঋণাত্মকতা কমে।
৫. ধাতব ও অধাতব ধর্ম
- ধাতব ধর্ম: পর্যায় সারণির বাম থেকে ডানে গেলে ধাতব ধর্ম কমে। (অর্থাৎ বামের মৌলগুলো বেশি ধাতব)।
- অধাতব ধর্ম: বাম থেকে ডানে গেলে অধাতব ধর্ম বাড়ে।
একটি চমৎকার উদাহরণ
পর্যায় সারণির প্রতিটি পর্যায়ের শুরুতে থাকে ক্ষার ধাতু (যেমন: লিথিয়াম, সোডিয়াম), যাদের আকার অনেক বড় হয়। আবার প্রতিটি পর্যায়ের একদম শেষে থাকে নিষ্ক্রিয় গ্যাস (যেমন: হিলিয়াম, নিয়ন), যাদের আকার সবচেয়ে ছোট হয়। এই যে বড় থেকে ধীরে ধীরে ছোট হওয়া এবং আবার নতুন পর্যায়ে গিয়ে বড় দিয়ে শুরু হওয়া—এটাই হলো পর্যায়বৃত্তিকতার চমৎকার বৈশিষ্ট্য।
আশা করি, আজকের এই আলোচনার পর পর্যায়বৃত্ত ধর্ম নিয়ে আপনার মনের সব ভয় কেটে গেছে। রসায়নের এই বিষয়গুলো একবার বুঝে নিলে পরীক্ষার খাতায় উত্তর দেওয়া যেমন সহজ, তেমনি বিজ্ঞানের প্রতি আপনার আগ্রহও বেড়ে যাবে বহুগুণ। মনে রাখবেন, বুঝে পড়াটাই হলো আসল শেখা। আমাদের আজকের এই ছোট প্রচেষ্টা যদি আপনার সামান্য উপকারেও আসে, তবেই আমাদের সার্থকতা। এরকম আরও অনেক জটিল বিষয়কে সহজভাবে বুঝতে এবং পড়াশোনায় নিজেকে এগিয়ে রাখতে Studytika.com-এর অন্যান্য ব্লগ পোস্টগুলো নিয়মিত পড়ুন। আমরা সব সময় চেষ্টা করি আপনাদের জন্য কঠিন পড়াগুলোকে সহজ করে উপস্থাপন করতে। সাথেই থাকুন, শিখতে থাকুন। ধন্যবাদ!