ছয় দফা কর্মসূচি কাকে বলে? (সহজ সংজ্ঞা) | ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির বিস্তারিত বিবরণ

প্রিয় বন্ধুরা, পড়াশোনা ও পরীক্ষার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো "ছয় দফা কর্মসূচি"। স্কুল, কলেজ কিংবা যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই টপিক থেকে প্রশ্ন আসেই আসে! কিন্তু বইয়ের কঠিন ভাষা আর জটিল সব শব্দের কারণে অনেকেই আমরা এটি সহজে বুঝতে পারি না বা মুখস্থ করতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলি। তোমরা কি জানো, এই ছয়টি দাবির ভেতরে আসলে কী কী লুকিয়ে ছিল? কেন এই দাবিগুলোকে বাঙালির "মুক্তির সনদ" বা ম্যাগনা কার্টা বলা হয়? আর ঠিক কোন কোন জাদুকরী দাবির কারণে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা একদম কেঁপে উঠেছিল? আজকের এই পোস্টে আমরা কোনো কঠিন শব্দ ছাড়া, একদম পানির মতো সহজ ভাষায় ছয় দফার খুঁটিনাটি সব তথ্য জানবো। তুমি যেকোনো ক্লাসের শিক্ষার্থী হও না কেন, আজকের পর এই টপিকটি তোমার কাছে একদম সহজ হয়ে যাবে। তাহলে চলো, দেরি না করে মূল আলোচনাটি দেখে নেওয়া যাক!

ছয় দফা কর্মসূচি কাকে বলে?(সহজ সংজ্ঞা)

ছয় দফা কর্মসূচি কী? (সহজ সংজ্ঞা)

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য যে ৬টি দাবি তুলে ধরেছিলেন, সেগুলোকে একসাথে ছয় দফা কর্মসূচি বলা হয়। 

এই দাবিগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের ভেতরে থেকেই আমাদের নিজেদের শাসন করার অধিকার বা স্বায়ত্তশাসন আদায় করা। এই ছয় দফাকে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ এবং "ম্যাগনা কার্টা" বলা হয়। এটিই পরবর্তীতে আমাদের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

ছয় দফা কর্মসূচি কাকে বলে? (সহজ সংজ্ঞা) | ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির বিস্তারিত বিবরণ

ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির বিস্তারিত বিবরণ

শিক্ষার্থীদের বোঝার সুবিধার্থে নিচে সহজ ভাষায় ছয়টি দাবি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

১. রাষ্ট্রীয় রূপ ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামো

পাকিস্তান দেশটিকে একটি ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র বানাতে হবে। ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের প্রদেশগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন (নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেওয়ার ক্ষমতা) দিতে হবে। দেশের শাসন ব্যবস্থা হবে সংসদীয় পদ্ধতির। প্রাপ্তবয়স্ক সব মানুষের সরাসরি ভোটে আইনসভার সদস্য বা প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন।

২. কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা

দেশ পরিচালনার সব ক্ষমতা থাকবে প্রদেশগুলোর হাতে। কেন্দ্রের মূল সরকারের কাছে থাকবে মাত্র দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

  • প্রতিরক্ষা: অর্থাৎ দেশের সীমানা রক্ষা ও সেনাবাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব।
  • পররাষ্ট্র নীতি: অর্থাৎ বাইরের অন্যান্য দেশের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্কের দায়িত্ব।

এই দুটি বিষয় ছাড়া বাকি সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের।

৩. মুদ্রা ও অর্থব্যবস্থা

টাকা বা মুদ্রা ব্যবস্থার জন্য দুটি সহজ বিকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল:

  • প্রথম বিকল্প: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি আলাদা কিন্তু সহজে বিনিময় করা যায় এমন মুদ্রা থাকবে। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাংক থেকে টাকা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেতে পারবে না।
  • দ্বিতীয় বিকল্প: পুরো দেশের জন্য একটাই মুদ্রা থাকবে। তবে সংবিধানে এমন কড়া নিয়ম থাকতে হবে যাতে পূর্ব পাকিস্তানের টাকা ও সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা রিজার্ভ ব্যাংকও থাকবে।

৪. রাজস্ব, কর ও শুল্ক নির্ধারণ

জনগণের কাছ থেকে ট্যাক্স, কর বা খাজনা আদায় করার সম্পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে শুধু প্রদেশগুলোর হাতে। কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি কোনো কর আদায়ের অধিকার থাকবে না। তবে কেন্দ্রীয় সরকার যেন চলতে পারে, সেজন্য প্রদেশগুলো তাদের আদায় করা ট্যাক্সের টাকার একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিত কেন্দ্রীয় সরকারকে দেবে।

৫. বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা

বিদেশি বাণিজ্যের ওপর প্রদেশগুলোর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ থাকবে:

  • পূর্ব পাকিস্তান বিদেশে পণ্য বিক্রি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা (যেমন: ডলার বা পাউন্ড) আয় করবে, তার ওপর পুরো অধিকার থাকবে পূর্ব পাকিস্তানেরই।
  • প্রদেশগুলো নিজেদের সুবিধামতো অন্য দেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের চুক্তি করতে পারবে এবং দরকার হলে বিদেশি সাহায্যও আনতে পারবে।

৬. আঞ্চলিক সেনাবাহিনী বা মিলিশিয়া বাহিনী

পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একটি আলাদা আধা-সামরিক বাহিনী (Paramilitary force) বা মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে। কারণ সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সেনা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না।

মনে রাখার মতো তথ্য: এই ছয়টি দাবি আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের কথা বললেও, এটিই মূলত আমাদের মনের ভেতর স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনে দিয়েছিল। তাই একে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ বলা হয়।

Getting Info...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.