কবিতা বা ছড়া পড়তে আমাদের সবারই ভালো লাগে। কিন্তু কেন ভালো লাগে? কারণ, কবিতার লাইনে এক ধরণের সুন্দর সুর ও দোলা থাকে। বাংলা ব্যাকরণে এই সুর ও দোলা সৃষ্টির নিয়মকেই ছন্দ বলা হয়। আজকের ব্লগে আমরা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য একদম সহজ ভাষায় বাংলা ছন্দ, এর প্রকারভেদ এবং এর খুঁটিনাটি সব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ছন্দ কাকে বলে? (Definition of Chhanda)
সহজ কথায়, কবিতার লাইনগুলোকে মিষ্টি ও শ্রুতিমধুর করার জন্য শব্দের যে সুশৃঙ্খল সাজানো রূপ বা বিন্যাস ব্যবহার করা হয়, তাকেই ছন্দ বলে।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক জীবেন্দ্র সিংহরায়ের মতে— কাব্যের রসঘন ও শ্রুতিমধুর বাক্যে সুশৃঙ্খল ধ্বনিবিন্যাসের ফলে যে সৌন্দর্য সৃষ্টি হয় তাকে ছন্দ বলে। অর্থাৎ, কবি যখন তাঁর কবিতার শব্দ ও ধ্বনিগুলোকে সুন্দর নিয়মে সাজান, তখন তা পড়ার সময় আমাদের কানে একটা মিষ্টি সুর লাগে। এই সুন্দর সাজানোর নিয়মটাই হলো ছন্দ।
একটি জরুরি নোট: ছন্দ সবসময় আমরা কীভাবে শব্দটা 'উচ্চারণ' করছি তার ওপর নির্ভর করে, বানানের ওপর নয়।
ছন্দের প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহ
ছন্দ ভালোভাবে বুঝতে হলে প্রথমে এর কয়েকটি জরুরি উপাদান বা অংশ সম্পর্কে জেনে নিতে হবে। এগুলো খুবই সহজ, নিচে একে একে দেওয়া হলো:
১. অক্ষর (Syllable)
আমরা মুখের এক ঝোঁকে বা একবারে শব্দের যতটুকু অংশ উচ্চারণ করতে পারি, তাকেই অক্ষর বা দল বলে। এটি ইংরেজি 'Syllable'-এর মতো। যেমন: 'কবিতা' শব্দটি উচ্চারণ করতে আমাদের তিনটি ঝোঁক লাগে— ক + বি + তা। এখানে ৩টি অক্ষর আছে।
২. যতি বা ছন্দ-যতি (Pause)
কবিতা পড়ার সময় নিঃশ্বাস নেওয়ার সুবিধার জন্য আমরা মাঝে মাঝে যেটুকু সময় থামি বা বিরতি নিই, তাকে যতি বলে। যতি মূলত ২ প্রকার:
- হ্রস্ব যতি: লাইনের মাঝখানে খুব অল্প সময়ের জন্য থামাকে হ্রস্ব যতি বলে। এটি ( ∣ ) চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হয়।
- দীর্ঘ যতি: লাইনের শেষে বা যেখানে বেশি সময় থামতে হয়, তাকে দীর্ঘ যতি বলে। এটি ( ∣∣ ) চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হয়।
৩. পর্ব (Bar)
একটি হ্রস্ব যতি থেকে আরেকটি হ্রস্ব যতি পর্যন্ত শব্দের অংশটুকুকে পর্ব বলা হয়। কয়েকটি মাত্রা নিয়ে একটি পর্ব তৈরি হয় এবং কয়েকটি পর্ব মিলে একটি পুরো লাইন বা চরণ তৈরি হয়। লাইনের একদম শেষের পর্বটি অনেক সময় ছোট বা অপূর্ণ হতে পারে।
উদাহরণ:
একলা ছিলেম ∣ কুয়োর ধারে ∣ নিমের ছায়া ∣ তলে ∣∣
কলস নিয়ে ∣ সবাই তখন ∣ পাড়ায় গেছে ∣ চলে ∣∣ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
এখানে 'একলা ছিলেম', 'কুয়োর ধারে'— প্রতিটি অংশই এক একটি পর্ব।
৪. মাত্রা (Mora/Unit)
একটি অক্ষর উচ্চারণ করতে আমাদের যতটুকু সময় লাগে, সেই সময়ের মাপকাঠিকে মাত্রা বলে। বাংলা ছন্দে একেক ধরণের নিয়মে মাত্রা গণনা একেক রকম হয়। এই মাত্রার কম-বেশির কারণেই ছন্দ আলাদা হয়।
৫. শ্বাসাঘাত (Accent)
কবিতা পড়ার সময় লাইনের বা পর্বের প্রথম অক্ষরের ওপর যে বাড়তি জোর বা ধাক্কা দিয়ে পড়তে হয়, তাকে শ্বাসাঘাত বা প্রস্বর বলে।
উদাহরণ:
আমরা আছি ∣ হাজার বছর ∣ ঘুমের ঘোরের ∣ গাঁয়ে ∣∣
এখানে 'আমরা', 'হাজার', 'ঘুমের' শব্দগুলোর শুরুতে একটু বাড়তি জোর দিয়ে পড়তে হয়।
৬. পদ ও চরণ (Line and Verse-foot)
দুইটি দীর্ঘ যতি বা পূর্ণ যতির মাঝখানের পুরো অংশটিকে বলা হয় চরণ (যাকে আমরা কবিতার একটি লাইন বলি)। আর চরণের মাঝখানে ছোট বিরতি দিয়ে যে অংশগুলো আলাদা করা হয়, সেগুলোকে বলে পদ।
উদাহরণ:
তরুতলে আছি ∣ একেলা পড়িয়া ⊥ দলিত পত্র ∣ শয়নে ∣∣ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
এখানে ( ⊥ ) চিহ্ন দিয়ে পদ আলাদা করা হয়েছে। পুরো লাইনটি হলো চরণ, আর ভেতরের ভাগগুলো হলো পদ।
৭. স্তবক (Stanza)
কয়েকটি লাইন বা চরণ মিলে কবিতার যে একটি প্যারা বা অংশ তৈরি হয়, তাকে স্তবক বলে। সাধারণত একটি স্তবকে কবিতার একটি নির্দিষ্ট ভাব প্রকাশ পায়।
৮. মিল (Rhyme)
কবিতার লাইনের শেষে শেষে যে একই রকম শুনতে শব্দের ব্যবহার করা হয়, তাকে মিল বা অনুপ্রাস বলে। লাইনের শেষের মিলকে বলা হয় অন্ত্যমিল। যেমন: 'তলে' এর সাথে 'চলে'।
বাংলা ছন্দের প্রকারভেদ
বাংলা কবিতার ছন্দ মূলত ৩ প্রকার। এগুলো হলো:
- স্বরবৃত্ত ছন্দ
- মাত্রাবৃত্ত ছন্দ
- অক্ষরবৃত্ত ছন্দ
তবে বিংশ শতাব্দী থেকে কবিরা এর বাইরে গদ্যছন্দ নামে আরেকটি ছন্দেও কবিতা লিখছেন। নিচে সবগুলোর সহজ বর্ণনা দেওয়া হলো:
১. স্বরবৃত্ত ছন্দ (ছড়ার ছন্দ)
এই ছন্দটি ছড়া বা হালকা কবিতায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। তাই একে 'ছড়ার ছন্দ'ও বলা হয়।
- মূল বৈশিষ্ট্য: এর মূল পর্ব সবসময় ৪ মাত্রার হয়।
- পড়ার গতি: এই ছন্দ খুব দ্রুত লয়ে বা তাড়াতাড়ি পড়তে হয়।
- নিয়ম: প্রতি পর্বের প্রথম অক্ষরে শ্বাসাঘাত (জোর) পড়ে এবং সব অক্ষরকে ১ মাত্রা ধরা হয়।
২. মাত্রাবৃত্ত ছন্দ
এই ছন্দটি শুনতে খুব মিষ্টি এবং এর একটি নিজস্ব সুরের দোলা আছে।
- মূল বৈশিষ্ট্য: এর মূল পর্ব ৪, ৫, ৬ বা ৭ মাত্রার হতে পারে।
- পড়ার গতি: এটি স্বরবৃত্তের চেয়ে একটু ধীর গতিতে কিন্তু অক্ষরবৃত্তের চেয়ে দ্রুত পড়তে হয়।
- মাত্রার নিয়ম: অক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি থাকলে (মুক্তাক্ষর) ১ মাত্রা এবং অক্ষরের শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে (বদ্ধাক্ষর) ২ মাত্রা ধরা হয়।
উদাহরণ:
এইখানে তোর ∣ দাদির কবর ∣ ডালিম-গাছের ∣ তলে ∣∣ (৬+৬+৬+২)
তিরিশ বছর ∣ ভিজায়ে রেখেছি ∣ দুই নয়নের ∣ জলে ∣∣ (৬+৬+৬+২) (কবর - জসীমউদদীন)
৩. অক্ষরবৃত্ত ছন্দ
এই ছন্দটি গম্ভীর এবং এর চাল বেশ ধীর বা শান্ত।
- মূল বৈশিষ্ট্য: এর মূল পর্ব সাধারণত ৮ বা ১০ মাত্রার হয়।
- পড়ার গতি: কবিতা আবৃত্তির গতি বেশ ধীর বা মন্থর হয়।
- মাত্রার নিয়ম: মুক্তাক্ষর ১ মাত্রা হয়। বদ্ধাক্ষর শব্দের শেষে থাকলে ২ মাত্রা হয়, কিন্তু শব্দের শুরুতে বা মাঝে থাকলে ১ মাত্রা হয়। একা একটি বদ্ধাক্ষর থাকলে তা ২ মাত্রা পায়।
উদাহরণ:
হে কবি, নীরব কেন ∣ ফাগুন যে এসেছে ধরায় ∣∣ (৮+১০)
বসন্তে বরিয়া তুমি ∣ লবে না কি তব বন্দনায় ∣∣ (৮+১০) (তাহারে পড়ে মনে - সুফিয়া কামাল)
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের প্রকারভেদ
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের আবার অনেকগুলো রূপভেদ বা প্রকার আছে। যেমন: পয়ার, মহাপয়ার, ত্রিপদী, চৌপদী, দিগক্ষরা, একাবলী, সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দ। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি নিচে আলোচনা করা হলো:
ক) সনেট (Sonnet / চতুর্দশপদী)
- সূচনা: বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট রচনা করেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
- রচয়িতা: মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ।
- গঠন: সনেটে মোট ১৪টি লাইন (চরণ) থাকে এবং প্রতি লাইনে ১৪ বা ১৮টি মাত্রা থাকে।
- স্তবক ভাগ: সনেটে দুটি স্তবক থাকে। প্রথম ৮ লাইনের স্তবককে বলা হয় অষ্টক (এখানে ভাবের সূচনা হয়) এবং শেষ ৬ লাইনের স্তবককে বলা হয় ষটক (এখানে ভাবের পরিণতি বা শেষ হয়)।
- মিল বিন্যাস: সনেটের ৩টি প্রধান রীতি রয়েছে, যেগুলোর অন্ত্যমিল বা শেষের শব্দের মিলের নিয়ম নিচে দেওয়া হলো:
- পেত্রার্কীয় রীতি: ক+খ+খ+ক ক+খ+খ+ক / চ+ছ+জ চ+ছ+জ
- শেক্সপীয়রীয় রীতি: ক+খ+ক+খ / গ+ঘ+গ+ঘ / চ+ছ+চ+ছ / জ+জ
- ফরাসি রীতি: ক+খ+খ+ক ক+খ+খ+ক / গ+গ / চ+ছ+চ+ছ
খ) অমিত্রাক্ষর ছন্দ (Blank Verse)
- প্রবর্তক: এই ছন্দেরও প্রবর্তক হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
- মূল বৈশিষ্ট্য: এই ছন্দের লাইনের শেষে কোনো মিল বা মিত্রাক্ষর থাকে না (তাই এর নাম অমিত্রাক্ষর)।
- ভাবের প্রবহমানতা: এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ভাব এক লাইন থেকে অন্য লাইনে অনায়াসে চলে যায়। একটি লাইনেই বাক্য শেষ করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। কবি নিজের ইচ্ছেমতো যেখানে খুশি বিরামচিহ্ন ব্যবহার করতে পারেন।
- গঠন: মিল না থাকলেও এর প্রতি লাইনে মাত্রা সংখ্যা নির্দিষ্ট থাকে (সাধারণত ১৪ মাত্রা) এবং পর্বের মাত্রাও নির্দিষ্ট (৮+৬) থাকে।
গদ্যছন্দ
- সূচনা: বাংলায় গদ্যছন্দে প্রথম সফল কবিতা লিখেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
- রবীন্দ্রনাথের কথা: "গদ্যের মধ্যে যখন পদ্যের রঙ ধরানো হয় তখন গদ্যকবিতার জন্ম হয়।"
- বৈশিষ্ট্য: এই ছন্দে পর্বের দৈর্ঘ্যের কোনো মিল বা সমতা থাকে না। লাইনগুলো ছোট-বড় হতে পারে।
- নিয়ম: এখানে পদ বা চরণ ছন্দের তাল দেখে নয়, বরং অর্থ প্রকাশের সুবিধার্থে বিরাম চিহ্ন (কমা, দাড়ি) দিয়ে ঠিক করা হয়। গদ্যের মতো লেখা হলেও এটি পড়ার সময় মনের ভেতর একটি সুন্দর সুরের আভাস পাওয়া যায়।
উদাহরণ:
আমার পূর্ব-বাংলা এক গুচ্ছ স্নিগ্ধ
অন্ধকারের তমাল
অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায় গঢ় নিকুঞ্জ... (আমার পূর্ব বাংলা - সৈয়দ আলী আহসান)
আশা করি, আজকের এই সহজ আলোচনার পর বাংলা ছন্দ নিয়ে আপনাদের মনের সব ভয় আর কঠিন ভাব দূর হয়ে গেছে। এখন থেকে যেকোনো কবিতা পড়ার সময় আপনারা খুব সহজেই এর ভেতরের সুর আর নিয়মগুলো ধরে ফেলতে পারবেন। আমাদের আজকের এই সহজ গাইডটি যদি আপনাদের ভালো লেগে থাকে এবং পড়াশোনায় সাহায্য করে, তবে অবশ্যই আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না।
পড়াশোনা, ব্যাকরণ এবং শিক্ষামূলক বিভিন্ন বিষয়ের জটিল সব টপিক এরকম সহজ ও মজার ছলে শিখতে আমাদের studytika.com ওয়েবসাইটের অন্যান্য পোস্টগুলো ঘুরে আসুন। নিয়মিত নতুন নতুন তথ্য ও দারুণ সব আপডেট পেতে আমাদের সাথেই থাকুন। ধন্যবাদ!