উপভাষা কাকে বলে? (সহজ সংজ্ঞা) | বাংলা ভাষার উপভাষার পরিচয় | উপভাষা কয় প্রকার ও কী কী?

বাংলা ভাষা যত বড়, ততই বৈচিত্র্যময়। আমাদের দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের কথা বলার ধরন, উচ্চারণ আর শব্দচয়ন একটু একটু করে আলাদা — আর সেই আলাদাভাবই ভাষাকে করে তোলে আরও রঙিন। কখনো শুনে মনে হয় মিষ্টি, কখনো আবার মজার! আজকের এই লেখায় আমরা এমন এক চমৎকার বিষয় নিয়ে কথা বলব, যা জানলে আপনি নিজের ভাষার সৌন্দর্যকে আরও ভালোভাবে চিনতে পারবেন। তাই চলুন, ধীরে ধীরে জানি আজকের আলোচনার আসল বিষয়টি কী!

উপভাষা কাকে বলে?(সহজ সংজ্ঞা)

উপভাষা (Dialect) কাকে বলে?

কোনো ভাষা সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ছোট ছোট দলে বা অঞ্চল বিশেষে প্রচলিত ভাষা ছাদকে উপভাষা বলে।

আরো বিস্তারিত বললে, উপভাষা হলো কোনো ভাষা সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট অঞ্চলে ব্যবহৃত ভাষার রূপ। ম্যাকসমুলার বলেন, “ভাষার প্রকৃত জীবন নিহিত আছে উপভাষায়।” সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্মে উপভাষাই ব্যবহার করে থাকে। অঞ্চলভেদে উচ্চারণ, ধ্বনি, রূপমূল, বাক্যগঠন প্রভৃতিতে কিছু পার্থক্য থাকলেও মূল ভাষার সঙ্গে এর তেমন ভিন্নতা দেখা যায় না। তাই বলা যায়, একই ভাষা অঞ্চলভেদে যে রূপে ব্যবহৃত হয়, তাই হলো আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা।

বাংলা ভাষার উপভাষার পরিচয়

বাংলা ভাষার উপভাষাগুলো এখনো পুরোপুরি গবেষণা বা জরিপ করা হয়নি। তবে ১৯০৩ সালে স্যার জর্জ গ্রায়ারসন ভারতবর্ষের বিভিন্ন উপভাষার নমুনা সংগ্রহ করেন এবং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “Linguistic Survey of India”-এর পঞ্চম খণ্ডে বাংলার উপভাষাসমূহের নমুনা ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন।

তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলার প্রধান উপভাষা পাঁচটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে—

  • ১. রাঢ়ী উপভাষা
  • ২. ঝাড়খণ্ডী উপভাষা
  • ৩. বরেন্দ্রী উপভাষা
  • ৪. বাঙালি (পূর্ববঙ্গীয়) উপভাষা
  • ৫. কামরূপী উপভাষা

১. রাঢ়ী উপভাষা

ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য:

  • অ-কারের পরিবর্তে ও-কার ব্যবহারের প্রবণতা: অতুল → ওতুল, মধু → মোধু।
  • অভিশ্রুতি ও স্বসঙ্গতির ফলে স্বরধ্বনির পরিবর্তন: রাখিয়া → রেখে, বিলাতি → বিলিতি।
  • আনুনাসিক স্বরের পূর্ণ ব্যবহার: চাঁদ, কাঁটা, বাঁধ।
  • শব্দের শুরুতে ‘র’-এর আগমন বা লোপ: আম → রাম, ওঝা → রোজা।
  • ‘ল’-এর স্থানে ‘ন’ উচ্চারণ: লুচি → নুচি, লেপ → নেপ।
  • ‘শ’-এর স্থলে ‘স’ উচ্চারণ: আশু → আসু, শশী → সসী।

রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য:

  • কর্ম কারকে বহুবচনে ‘দেয়’ বিভক্তি।
  • কর্ম ও সম্প্রদানে ‘কে’ বিভক্তির ব্যবহার।
  • অধিকরণ কারকে ‘তে’ বিভক্তি।
  • অতীতে অকর্মক ক্রিয়ায় ‘ল’ ও সকর্মকে ‘লে’ বিভক্তি: সে গেল, সে দিলে।
  • অতীতে উত্তম পুরুষে ‘লুম’, ‘নু’, ‘লম’ বিভক্তি: আমি দেখলুম, আমি দেখনু।

২. ঝাড়খণ্ডী উপভাষা

  • আনুনাসিক ধ্বনির প্রচুর ব্যবহার: চাঁ, হঁইছে।
  • অনুসর্গহীন সম্প্রদান কারক: জলকে চল, ঘাসকে গেলছ।
  • নামধাতুর ব্যবহার: জাড়াবে (শীত করবে)।
  • ‘আছ’ ধাতুর স্থলে ‘বট’ ধাতুর ব্যবহার: কবি বটে = করছে।

৩. বরেন্দ্রী উপভাষা

  • স্বরধ্বনি প্রায় রাঢ়ী উপভাষার মতো।
  • আনুনাসিক স্বর রক্ষিত।
  • ঘোষ ধ্বনির মহাপ্রাণতা রক্ষিত।
  • শ্বাসাঘাতের নির্দিষ্ট স্থান নেই।
  • জ ধ্বনি কখনও য রূপে উচ্চারিত: কাগজ → কাগয।
  • ‘র’ ধ্বনির আগমন বা লোপ: রস → অস, আম → রাম।
  • অধিকরণ কারকে ‘ত’ বিভক্তি ও অতীতে উত্তম পুরুষে ‘রাম’ বিভক্তি যুক্ত হয়।
  • ‘শ, ষ, স’—সব উচ্চারণ ‘স’ এর মতো হয়।

৪. বাঙালি (পূর্ববঙ্গীয়) উপভাষা

  • অপিনিহিতি স্বর রক্ষিত: রাখিয়া → রাইখ্যা, বলিয়া → বইল্যা।
  • যফলা ও যুক্তব্যঞ্জনে স্বরাগম: সত্য → সইত্ত, ব্রাহ্ম → ব্রাইম্ম।
  • ‘এ’ উচ্চারণ ‘এ্যা’-এর মতো: মেঘ → ম্যাগ, দেখা → দ্যাখ্যা।
  • ‘ও’-কারের উচ্চারণ উ-কারের মতো: চোর → চুর, গোল → গুল।
  • আনুনাসিক স্বর বজায় থাকে: চান্দ → চাঁদ।
  • শ্বাসাঘাতের নির্দিষ্ট স্থান নেই।
  • মহাপ্রাণ ধ্বনি লোপ: ভাই → বাই, খালু → কালু।
  • অঘোষ ধ্বনি ঘোষবৎ উচ্চারিত: ছোট → ছুডু, কেটা → কেডা।
  • ‘শ, স, য’-এর স্থলে ‘হ’ উচ্চারণ: শালা → হালা।
  • ‘ড়,ঢ়’-এর স্থলে ‘র’ উচ্চারণ: আষাঢ় → আষার।
  • ‘হ’-এর উচ্চারণ কখনো ‘অ’-এর মতো: হইবে → অইবে।
  • কর্তৃকারকে ‘এ’, সম্প্রদানে ‘রে’, অধিকার ‘ত’, সম্বন্ধে ‘বার’ বিভক্তি। যেমন: তাসনিমে খায়, ফকিররে দাও।
  • তুমর্থে ‘অন’ বিভক্তি: খাওন, আসন।
  • যশোর-খুলনা অঞ্চলে ‘তি’ বিভক্তি ব্যবহৃত হয়: নাতি, খাতি।

৫. কামরূপী উপভাষা

  • ও-কারের উচ্চারণ সংবৃত: জ্যোতিষ → জুতিয।
  • শব্দের শুরুতে অ → আ: অষ্ট → আষ্ট।
  • পদের শেষে অ → ও: হইতে → অইতো।
  • শব্দের শুরুতে অ → উ: ডগা → ডুগা।
  • পদের মধ্যে প → ফ উচ্চারণ: আপদ → আফদ।
  • শব্দের মধ্যে র-এর আগমন: সম্মান → সর্মান।
  • ভবিষ্যৎ কালে ক্রিয়ায় ‘বাম’ প্রত্যয় যুক্ত হয়: করিব → করিবাম, খাইব → কাইবাম।

উপসংহার

বাংলা ভাষার উপভাষাগুলোর এই বিভাজন একটি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতে করা হয়েছে। আরও বিশদ গবেষণা করলে এগুলোকে আরও ক্ষুদ্র শ্রেণীতে ভাগ করা সম্ভব। তবুও এই শ্রেণীবিভাগ থেকে আমরা বাংলা ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্য ও ধ্বনিগত সৌন্দর্য সম্পর্কে ভালো ধারণা পাই।

আরও এমন সহজ ও শিক্ষণীয় লেখা পড়তে ভিজিট করুন StudyTika.com 🌿

Getting Info...

إرسال تعليق

Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.