আমাদের শরীর কীভাবে বড় হয়? কীভাবে ছোট একটি চারাগাছ বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়? কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আমাদের শরীরের কোথাও কেটে গেলে কয়েকদিন পর সেখানে নতুন চামড়া কীভাবে গজায়? এই সবকিছুর পেছনে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক অদ্ভুত জাদুকরী প্রক্রিয়া। বিজ্ঞানীরা একে বলেন 'মাইটোসিস'। আপনি যদি মনে করেন কোষ বিভাজন মানেই কঠিন কোনো বিজ্ঞানের সমীকরণ, তবে আজকের এই পোস্টটি আপনার সেই ধারণা বদলে দেবে। একটি কোষ থেকে কীভাবে হুবহু তার মতো আরও দুটি কোষ তৈরি হয় এবং কেন একে 'সমীকরণিক বিভাজন' বলা হয়—তা জানতে আজকের লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন। এই রহস্যটি না জানলে জীববিজ্ঞানের অনেক মজাদার বিষয় আপনার কাছে অজানাই থেকে যাবে!
মাইটোসিস কাকে বলে?
যে কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় একটি প্রকৃত কোষের নিউক্লিয়াস ও ক্রোমোজোম উভয়ই একবার করে বিভক্ত হয়ে সমান সংখ্যক ক্রোমোজোম বিশিষ্ট দুটি অপত্য কোষ সৃষ্টি করে, তাকে মাইটোসিস বলে।
মাইটোসিস হলো এমন একটি উন্নত ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি মাতৃকোষ (পুরানো কোষ) থেকে ঠিক তার মতো দেখতে দুটি নতুন অপত্য কোষ (নতুন জন্ম নেওয়া কোষ) তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় নতুন কোষ দুটির ক্রোমোজোম সংখ্যা, আকার এবং গুণাবলি হুবহু আগের কোষটির মতোই থাকে।
মাইটোসিসকে 'সমীকরণিক বিভাজন' কেন বলা হয়?
অংকের সমীকরণের যেমন দুই পক্ষ সমান থাকে, তেমনি মাইটোসিসে মাতৃকোষের ক্রোমোজোম সংখ্যা এবং নতুন তৈরি হওয়া কোষের ক্রোমোজোম সংখ্যা সমান থাকে। তাই একে 'সমীকরণিক বিভাজন' বলা হয়।
মাইটোসিসের মূল বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব
- কোথায় ঘটে: এটি উন্নত প্রাণীর দেহকোষে ঘটে। আমাদের হাত, পা বা ত্বকের কোষগুলো এই পদ্ধতিতেই বৃদ্ধি পায়।
- ফলাফল: একটি কোষ ভেঙে দুটি একদম একই রকম নতুন কোষ তৈরি হয়।
- ক্রোমোজোম সংখ্যা: মানুষের ক্ষেত্রে মাতৃকোষে ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকলে নতুন কোষেও ৪৬টিই থাকবে। অর্থাৎ ক্রোমোজোম সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে।
- বৃদ্ধি ও মেরামত: ছোট থেকে বড় হওয়া, শরীরের কোনো ক্ষতস্থান পূরণ করা এবং প্রজনন অঙ্গের বৃদ্ধিতে এই বিভাজন প্রধান ভূমিকা পালন করে।
মাইটোসিসের ধাপসমূহ
একটি কোষ বিভাজিত হওয়ার আগে নিজেকে তৈরি করে নেয়, যাকে ইন্টারফেজ (Interphase) দশা বলা হয়। এরপর মূল বিভাজনটি পাঁচটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
১. প্রফেজ (Prophase)
এটি বিভাজনের প্রথম ধাপ। এখানে ক্রোমোজোমগুলো পানি ত্যাগ করে সংকুচিত হতে থাকে এবং আকারে খাটো ও মোটা হয়ে দৃশ্যমান হয়।
২. প্রোমেটাফেজ (Prometaphase)
এই ধাপে স্পিন্ডল যন্ত্র বা তন্তুর সৃষ্টি হয় এবং নিউক্লিয়াসের পর্দা বিলুপ্ত হতে শুরু করে।
৩. মেটাফেজ (Metaphase)
এই ধাপে ক্রোমোজোমগুলো কোষের মাঝখানের অংশে (বিষুবীয় অঞ্চলে) অবস্থান করে। ক্রোমোজোমগুলোকে এই সময়ে সবচাইতে স্পষ্ট দেখা যায়।
৪. অ্যানাফেজ (Anaphase)
এখানে ক্রোমোজোমগুলো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দুই মেরুর দিকে বা দুই প্রান্তের দিকে সরতে শুরু করে। এটি হলো চলন পর্যায়।
৫. টেলোফেজ (Telophase)
এটি শেষ ধাপ। এখানে দুই প্রান্তে ক্রোমোজোমগুলো অবস্থান নেয় এবং আবার নিউক্লিয়াসের পর্দা তৈরি হয়। ফলে একটি কোষ থেকে দুটি নতুন নিউক্লিয়াস গঠিত হয়।
এভাবেই একটি কোষ থেকে হুবহু দুটি নতুন কোষ তৈরির মাধ্যমে আমাদের দেহের বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।
আশা করি, মাইটোসিসের এই চমৎকার প্রক্রিয়াটি আপনি খুব সহজেই বুঝতে পেরেছেন। প্রকৃতি কত সুন্দরভাবে আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের ভারসাম্য বজায় রাখে, তা সত্যিই ভাববার মতো। বিজ্ঞানের এমন সব জটিল বিষয়কে সহজভাবে জানতে আমাদের সাথেই থাকুন। studytika.com-এ আমরা আপনার পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক করতে নিয়মিত এরকম আরও অনেক শিক্ষামূলক পোস্ট শেয়ার করি। জীবনবিজ্ঞান, ব্যাকরণ বা সাধারণ জ্ঞানের আরও নতুন নতুন তথ্য জানতে আমাদের ওয়েবসাইটের অন্যান্য পোস্টগুলোও একবার দেখে নিতে পারেন। আপনার বন্ধুদের সাথেও এই তথ্যগুলো শেয়ার করতে ভুলবেন না!