বাংলাদেশের উৎসব রচনা Class 7 8 9 10 ‍SSC HSC (২০+ পয়েন্ট)

 বাংলাদেশের উৎসব আমাদের জীবনের আনন্দের মুহূর্ত। এই রচনাটি আপনাকে বাংলাদেশের বিভিন্ন উৎসবের মাধুর্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে সহজ ভাষায় বুঝতে সাহায্য করবে। আসুন, এই রচনা পড়ে জানুন আমাদের প্রিয় উৎসবগুলোর বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশের উৎসব রচনা Class 7 8 9 10 ‍SSC HSC (২০+ পয়েন্ট)

বাংলাদেশের উৎসব রচনা ১

ভূমিকা: উৎসব একটি জনপদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা সেই এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোককথা ও মানুষের বিশ্বাস ও অনুভূতির প্রকাশ ঘটায়। কোনো জাতি বা সমাজের উৎসব সম্পর্কে জানলে তাদের জীবনধারা ও মানসিকতার অনেক কিছুই বোঝা যায়। উৎসব কখনও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীভিত্তিক, আবার কখনও তা একটি নির্দিষ্ট এলাকা বা ভূখণ্ড ঘিরে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে নানা ধরনের উৎসব প্রচলিত রয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই কোনো নির্দিষ্ট ঋতু বা মাসকে কেন্দ্র করে উদযাপিত হয়। এসব উৎসব শুধু আনন্দই দেয় না, বরং দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি সমগ্র চিত্র তুলে ধরে।

বাংলা বর্ষবরণ: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও সর্বজনীন উৎসব হলো বাংলা নববর্ষ। পুরোনো দিনের দুঃখ-কষ্ট ভুলে নতুনকে স্বাগত জানানোর এই উৎসবে সারা দেশজুড়ে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। ধর্ম, বর্ণ, বয়স বা পেশা নির্বিশেষে সবাই মিলেই এই উৎসব উদযাপন করে। এদিন নানা জায়গায় মেলা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলে পুরোনো দেনা-দায় চুকাতে ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানান এবং মিষ্টিমুখ করান। বৈশাখের প্রথম দিনে প্রায় প্রতিটি পরিবারে সামর্থ্য অনুযায়ী বিশেষ খাবারের আয়োজন থাকে। রাজধানী ঢাকায় বাংলা নববর্ষকে ঘিরে হয় বড় ধরনের আয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং রমনার বটমূলে নতুন বছরের সূর্য ওঠার সময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

বৈসাবি: বাংলাদেশে তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বর্ষবরণ উৎসব 'বৈসাবি'। শব্দটি বৈসু, সাংগ্রাই, বিজু - এই তিন নামের আদ্যক্ষর নিয়ে গঠিত। বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু যথাক্রমে ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমাদের বর্ষবরণ উৎসব। সাধারণত বছরের শেষ দুই দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় বৈসাবি উদ্যাপিত হয়।

নবান্ন: নবান্ন হলো নতুন ধানের উৎসব। হেমন্ত কালে ঘরে ঘরে নতুন ধান ওঠে। এ সময়ে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়। আত্মীয়-পরিজন ও প্রতিবেশীদের উপস্থিতিতে ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।

একুশে ফেব্রুয়ারি: একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির দীর্ঘ দিনের সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে মিছিলকারীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। তাদের উপর তৎকালীন সরকারের নির্দেশে পুলিশ গুলি চালায়। এতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ অনেকে শহিদ হন। এই আত্মত্যাগ এবং দীর্ঘ সংগ্রামের ফলস্বরূপ ১৯৫৪ সালে বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি। শহিদদের স্মৃতিকে স্মরণ করতে ও শ্রদ্ধা জানাতে পরের বছর থেকেই দিনটি উদ্যাপিত হয়ে আসছে। নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরিতে অংশগ্রহণ, শহিদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, আলোচনা সভা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে সারা দেশে দিবসটি পালিত হয়। শহিদদের আত্মদান ও পৃথিবীর সকল মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে ঘোষণা দেয়। পরের বছর অর্থাৎ ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির এই আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করতে কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

দুর্গা পূজা: হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড়ো ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পুজা। শরৎকালে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সপ্তমী অষ্টমী নবমী এই তিন দিন দুর্গাপুজা অনুষ্ঠিত হয়। তবে সপ্তমীর আগের দিন ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর বোধন অনুষ্ঠান হয়। নবমীর পরদিন দশমীর উৎসবকে বলা হয় বিজয়া দশমী। বোধন থেকে বিসর্জনের দিনগুলো বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনকে আন্দোলিত করে। পাড়ায় পাড়ায় তৈরি হয় পূজা মণ্ডপ, থাকে প্রসাদের আয়োজন। বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হয় মেলা। দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব হলেও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও আনন্দ নিয়ে পূজামণ্ডপে ঘুরতে যায়। অষ্টমীর দিন আনন্দ আর জাঁকজমক থাকে বেশি। রাতে হয় আরতি। দশমীর দিন দেবী-বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা।

বুদ্ধ পূর্ণিমা: বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উদ্যাপিত হয় বলে এর অন্য নাম বৈশাখী পূর্ণিমা। এই দিনের সঙ্গে গৌতম বুদ্ধের জন্ম, তিরোধান ও বোধিলাভের স্মৃতি জড়িত। প্রার্থনা ও দান-দক্ষিণার মাধ্যমে এবং ফানুশ উড়িয়ে এই উৎসব পালন করা হয়।

বড়ো দিন: বাংলাদেশের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা পালন করে বড়ো দিন। যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন উপলক্ষে তারা এ উৎসব পালন করে। প্রতি বছর ২৫শে ডিসেম্বর বড়ো দিনের উৎসব পালিত হয়। গির্জায় প্রার্থনা করে, কেক কেটে, চকলেট বিতরণ করে, গান গেয়ে এই উৎসব পালন করা হয়।

অন্যান্য উৎসব: এছাড়া সারা বছরই বাংলাদেশে কোনো না কোনো উৎসব পালিত হয়। যেমন: রবীন্দ্র জয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী, লালন-উৎসব, মধুমেলা, মহররম, ঈদ-ই মিলাদুন নবি, সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মী পূজা, প্রবারণা পূর্ণিমা, ইস্টার সানডে ইত্যাদি।

উপসংহার: মানুষের জীবনে উৎসবের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। উৎসব মানুষের মধ্যে সাম্য ও মৈত্রী গড়ে তোলে। আনন্দমুখর উৎসব-প্রাঙ্গণে ঘুচে যায় মানুষে মানুষে ভেদাভেদ। উৎসব ছাড়া সকল শ্রেণির মানুষের মিলনমেলার চিত্র কল্পনাই করা যায় না। জাতীয় উৎসবগুলো মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমকে জাগ্রত করে। উৎসবের মধ্যে যে মূল্যবোধের বীজ আছে তাকে জাগ্রত করতে পারলে নিজস্ব সংস্কৃতি যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি মানুষের মধ্যে গড়ে উঠবে প্রীতি ও সৌহার্দ্য।

বাংলাদেশের উৎসব রচনা ২

ভূমিকা : উৎসব মানবজীবনে প্রাণচঞ্চল আনন্দময়তার অভিব্যক্তি। কেবল অন্ন-বস্ত্র সংস্থানেই মানবজীবনে সার্থকতা আসে না। তার জীবনে চাই অবাধ মুক্তির আনন্দ। সে আনন্দ লাভের একটি উপায় উৎসব ও মানব সম্মিলন।

উৎসবের তাৎপর্য : দৈনন্দিন জীবন-সংগ্রামে অবসিত মানুষের প্রাণশক্তি যখন শুকিয়ে আসে, যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে “জীবনের খণ্ড খণ্ড করি দণ্ডে দণ্ডে ক্ষয়” তখন উৎসবের আয়োজন মনে আনে ফূর্তি, আনে মুক্তি জীবনের আনন্দ, সৃষ্টি করে নতুন কর্মপ্রেরণা। পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতির উৎসবে মানুষে মানুষে হয় আত্মিক মিলন। মানুষের জীবনে ব্যক্তিগত ক্ষুদ্রতা, গ্লানি, দীনতা ও তুচ্ছতা ছাপিয়ে ওঠে উদার প্রাণের ঐশ্বর্য। উৎসবের মধ্য নিয়ে ফুটে ওঠে জাতীয় সংস্কৃতির বৃহত্তর ও ব্যাপক রূপ।

উৎসবের রূপ-রূপান্তর : আদিম আরণ্যক জীবন থেকেই মানুষ উৎসবপ্রবণ। তখন যৌথ উদ্যোগে পশু শিকার শেষে সম্মিলিতভাবে সান্ধ্য উৎসব হতো আগুন জ্বেলে, নেচে গেয়ে ভোজে মিলিত হয়ে। সভ্যতার রূপ রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবেরও ঘটেছে নানা রূপান্তর, স্থান ও কালের পটভূমিতে এসেছে নানা বৈচিত্র্য।

নানা ধরনের উৎসব : নানান প্রকৃতি, পরিবেশ, ধর্ম ও জীবনধারার ভিন্নতার কারণে আমাদের উৎসবগুলোর মধ্যেও দেখা যায় বৈচিত্র্য। এসব উৎসবকে প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়: (১) ধর্মীয় উৎসব; (২) পারিবারিক উৎসব; (৩) ঋতুভিত্তিক উৎসব; (৪) জাতীয় উৎসব; (৫) আন্তর্জাতিক উৎসব। ঈদ, দুর্গাপূজা, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা ইত্যাদি ধর্মীয় উৎসবের অন্তর্ভুক্ত। জন্মদিন ও বিয়ে পারিবারিক উৎসবের উদাহরণ। বর্ষবরণ ও বসন্ত উৎসব হল ঋতুভিত্তিক উৎসব। শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস জাতীয় উৎসব হিসেবে পালন করা হয়। আর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, অলিম্পিক ও বিশ্ব যুব উৎসব আন্তর্জাতিক উৎসবের অন্তর্ভুক্ত।

উৎসবের উপযোগিতা : উৎসব কেবল মানব সম্মিলনের আনন্দ দেয় না, প্রাণের স্ফূরণ ঘটিয়ে শারীরিক ও মানসিক শক্তিকে সতেজ রাখে, দেয় নব নব কর্মপ্রেরণা। উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের সৃজনশীলতারও নানা প্রকাশ ঘটে। রচিত হয় সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চলচ্চিত্রের কত না সম্ভার। উৎসবের অর্থনৈতিক উপযোগিতাও কম নয়। উৎসবকে কেন্দ্র করে যে ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা চলে তাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনেক পেশার মানুষ উপকৃত হয়।

উপসংহার : উৎসব মানুষে মানুষে প্রীতির বন্ধনকে দৃঢ় করে, হৃদয়কে করে প্রসারিত। উৎসব সঞ্চারিত করে অপার আনন্দ, দেয় নবতর চেতনা। জাতীয় উৎসব জাতীয় চেতনাকে করে সংহত। আন্তর্জাতিক উৎসব প্রশস্ত করে শান্তি, মৈত্রী ও সৌহার্দ্যের পথ। উৎসব মানুষের চৈতন্যে বিস্তার ঘটায় সুরুচি ও শিল্পবোধের।

আশা করি, আপনাদের এই রচনাটি ভালো লেগেছে। আরও রচনা পড়তে, অনুগ্রহ করে আমার ওয়েবসাইট StudyTika.com-এ গিয়ে আরও রচনা পড়ুন।

Getting Info...

إرسال تعليق

Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.