ইন্টারনেট রচনা Class 7 8 9 10 ‍SSC HSC (২০+ পয়েন্ট)

 ভূমিকা: ইন্টারনেট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই এই ব্লগপোস্টে সহজ ভাষায় একটি সুন্দর রচনা দেয়া হয়েছে। রচনাটি পড়লে আপনি ভালোভাবে জানতে পারবেন এবং পরীক্ষায় ভালো লিখতেও পারবেন। চলুন রচনাটি শুরু করা যাক।

ইন্টারনেট রচনা Class 7 8 9 10 ‍SSC HSC (২০+ পয়েন্ট)

ইন্টারনেট রচনা ১

ভূমিকা

বিজ্ঞান মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা, স্বপ্ন ও কল্পনার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। বর্বর জীবনকে পশ্চাতে ফেলে বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষ আজ সভ্যতার আলোকে আলোকিত ও সম্পদশালী । তিনটি আবিষ্কার সভ্যতাকে আমূল পরিবর্তন করেছে। এগুলো হলো- আগুন, চাকা ও বিদ্যুৎ। পরবর্তীতে মানুষের কল্যাণে আবিষ্কারের মধ্যে বিভিন্ন রোগনির্ণয় যন্ত্র, প্রতিষেধক, মহাকাশ গবেষণা যন্ত্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইথার ব্যবহারের উন্নত যন্ত্রপাতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যোগাযোগ ও তথ্য সংগ্রহের ব্যবহারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ইন্টারনেট প্রযুক্তি।

ইন্টারনেট

আসলে ইন্টারনেট কোনো একক বিষয় নয়। এটি অসংখ্য কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশ্বব্যাপী বিশাল যোগাযোগব্যবস্থা। ইংরেজিতে একে বলা হয় Inter Networking বা World Wide Electronic Network। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যক্তিগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কম্পিউটারগুলো খুব অল্প সময়ে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে এবং সহজেই তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এর প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আজ পুরো বিশ্ব যেন মানুষের হাতের মুঠোয় এসে গেছে।

ইন্টারনেট ব্যবহারের সূচনা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ ১৯৬৯ সালে প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করে। পারমাণবিক আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বৈজ্ঞানিক তথ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানের উদ্দেশ্যে তারা এই নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। শুধু ৪টি কম্পিউটারের সাহায্যে টেলিফোনের বিকল্প হিসেবে এ ধরনের পদ্ধতি চালু হয়। ‘ডাৰ্পানেট’ নামে পেন্টাগনের এই যোগাযোগ ব্যবস্থা তিন বছরে ‘অর্পানেট’ নাম ধারণ করে। তখন কম্পিউটারের সংখ্যা ৪টি থেকে বেড়ে ৩৩টিতে উন্নীত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন জনসাধারণের যোগাযোগ সুবিধা দানে ‘নেস্টেনেট’ নামক একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করে। গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে ‘নেস্টেনেট’ নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘ইন্টারনেট’ নাম ধারণ করে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯০ মিলিয়ন কম্পিউটার ব্যবহারকারী আছে। এই সংখ্যা প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। (ইন্টারনেট রচনা)

ইন্টারনেট ব্যবহারের নিয়মনীতি

 ইন্টারনেট ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি আছে। এই নিয়মনীতিকে বলে ‘ইন্টারনেট প্রটোকল’। দুই বা তার চেয়ে বেশি কম্পিউটারের মধ্যে নির্দিষ্ট প্রটোকল না থাকলে নেটওয়ার্কের কম্পিউটারের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বা পারস্পরিক যোগাযোগ সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম প্রটোকল লক্ষ করা যায়। এর মধ্যে TCP (Transmission Control Protocol) বা IP (Internet Protocol) সবচেয়ে দক্ষ ও পুরনো প্রটোকল । অনেক বড় আকারের ফাইলও এর মাধ্যমে অতি সহজে আদান-প্রদান করা যায়। ইন্টারনেটের নিয়মাবলি ও কর্মকাণ্ড সুসম্পন্নের জন্য তিনটি প্রধান প্রতিষ্ঠান কাজ করে। এগুলো হচ্ছে-Internet Network Information Centre (NIC) : এটি ডোমেইন নাম (G.V.) রেজিস্ট্রারের কাজ করে।

Internet Society : এটি ইন্টারনেটের প্রকৌশল নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে ক্লিয়ারিং হাউস হিসেবে কাজ করে।

World Wide Web Consortium : এটি ভবিষ্যতে ওয়েবের প্রোগ্রামিং ভাষা নির্ধারণের কাজ করে। ইন্টারনেট সংযুক্তির উপায় : ইন্টারনেটে দুটি পদ্ধতিতে কম্পিউটারকে সংযুক্ত করা হয়। একটি Fi On Line Service-এর মাধ্যমে সরাসরি, অন্যটি Fi Off Line Service-এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে। অনলাইন সার্ভিসের মাধ্যমে যেকোনো একটি নেটওয়ার্কের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে যখন-তখন ইন্টারনেট সুবিধা লাভ করা যায়। অনলাইন সার্ভিসের মাধ্যমে Internet Access সুবিধা পাওয়া যায়। এতে ইন্টারনেটের সবধরনের সুবিধা পেতে যেসব software tools প্রয়োজন তার uptodate এবং upgraded version-এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়। এতে তুলনামূলকভাবে সময় বেশি লাগে। সাধারণত ৩ ধরনের নেটওয়ার্কিং সিস্টেম থেকে ইন্টারনেট সংযুক্ত হয়ে থাকে। এগুলো হলো- Fi LAN (Local Area Network), Fi MAN (Metropolitan Area Network) এবং FI WAN (Wide Area Network)। প্রথমটি এক কিলোমিটারের মধ্যে, দ্বিতীয়টি কয়েক কিলোমিটারব্যাপী এবং তৃতীয়টি বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্কিংয়ের কাজ করে। (ইন্টারনেট রচনা)

ইন্টারনেট ব্যবহার পদ্ধতি

 ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য কম্পিউটার, মডেম, টেলিফোন লাইন এবং ইন্টারনেট প্রোভাইডার- এই • জিনিস দরকার। প্রথমে কম্পিউটারে তথ্যাদি টাইপ করে এর মেমোরিতে রাখতে হয়। পরে সুবিধামতো নেটওয়ার্কিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে তা প্রাপকের কাছে পাঠানো হয়। মডেম (Modulator) হচ্ছে একধরনের ডিভাইস। এটি সাধারণত টেলিফোন লাইনের মাধ্যমে তথ্যাদি প্রেরণ উপযোগী করতে এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারের তথ্যাদিকে ডিজিটাল থেকে এনালগ এবং | এনালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরিত করে। টেলিফোন লাইন তথ্যাদি স্থানান্তরের কাজে সহায়তা করে। এটি ছাড়া ইন্টারনেটের প্রোভাইডার মূলত ব্যবহৃত সময়ের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট একটি চার্জ নিয়ে তাদের নিজস্ব শক্তিশালী কম্পিউটার ফাইবার অপটিকসের কোনো প্রক্রিয়াই সম্ভব নয়। কারণ এর লাইনের স্পিডের ওপর তথ্যাদি দ্রুত স্থানান্তরিত হওয়া নির্ভর করে। ইন্টারনেট সার্ভিস। মাধ্যমে দেশ-বিদেশে অন্য ইন্টারনেট সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। 

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার

বাংলাদেশে প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু হয় ১৯৯৩ সালে। শুরুর দিকে এটির অফলাইনের মাধ্যমে। যোগাযোগ শুরু হয়। ফলে তথ্যের বিশাল জগতের সম্পদের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছিল না। এতে কেবল তথ্য ডাউনলো | আপলোড করা সম্ভব হতো। এর মাধ্যমে কেবল ই-মেইল সার্ভিসের সুবিধা পাওয়া যেত। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সাল থেকে ISN ● (Information Service Network) নামের একটি ফার্ম একটি সার্ভার স্থাপন করে অনলাইন ইন্টারনেটের সংযোগ দেওয়া শুরু করে। সেসময়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল এক হাজারের কিছু বেশি। ২০০১ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ৬০ হাজারে। বর্তমানে প্রায়। ৫০ লাখ লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ইন্টারনেট সুবিধা প্রদানের জন্য ১২টি প্রতিষ্ঠান অনলাইন সংযোগের কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এদেশেও ইন্টারনেটের ব্যাপক চাহিদা ও ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে। (ইন্টারনেট রচনা)

ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা

ইন্টারনেট হলো কম্পিউটারের একটি নেটওয়ার্কিং সুবিধা, যা সারাবিশ্বে আন্তঃযোগাযোগ স্থাপনের পথ সহজ করে দিয়েছে। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে কম্পিউটার থেকে কম্পিউটারে মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে মানুষের জীবনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন এসেছে। এর মাধ্যমে অল্প সময়ে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে তথ্য আদান-প্রদান করা যায় বলে মানুষ তথ্যগত ব্যাপক সুবিধা লাভ করছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি-উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য, শিক্ষা, বিনোদন প্রভৃতি ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগ অবারিত হচ্ছে। ইন্টারনেটের সাহায্যে মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়া যেকোনো ঘটনা বিশ্ববাসী জানতে পারছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষ নানা জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে মানুষ অনলাইনে বই পড়ার সুযোগ লাভ করছে। এছাড়া ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে ছাত্রছাত্রীরা চ্চতর ডিগ্রি লাভ করছে। নিম্নলিখিত উপায়গুলোর মাধ্যমে মানুষ সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট সুবিধা ভোগ করছে।

  • www (World Wide Web) : এর মাধ্যমে একই সময়ে চিত্র ও শব্দ সহকারে তথ্য পাওয়া যায়। এটি একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। 2. E-mail (Electronic Mail) : এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পৃথিবীর যেকোনো ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সাথে তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। 3. FTP Session (File Transfer Protocol) : এটির মাধ্যমে একটি কম্পিউটার থেকে আরেকটি কম্পিউটারের মধ্যে ফাইল আদান-প্রদান করা যায়।
  • Telernet (Telephone Network) : এটির সাহায্যে একটি কম্পিউটারে যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অন্য কম্পিউটারের সাথে সংযুক্ত হয় তা ব্যবহার করা যায়।
  • Net News : এ Protocol-এর মাধ্যমে অতি সহজে News group গুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। সাংবাদিকরা এ ইন্টারনেটের মূল ব্যবহারকারী।
  • IRC (Internet Relay Chat) : এটির মাধ্যমে অসংখ্য ইন্টারনেট ব্যবহারকারী একই সাথে নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময়, কথা বলা, আলাপ আলোচনা করতে পারে।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের ভেতরে মানবিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বলয় তৈরিকে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক বলে । সরাসরি যোগাযোগ ও মতবিনিময়কে আরও নিবিড় করে তোলার উদ্দেশ্য নিয়েই শুরু হয়েছিল সামাজিক নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের সীমানা ক্রমশ বেড়ে চলছে। ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক নেটওয়ার্কের সাইটগুলো এই সম্পর্ক একই সঙ্গে সহজ ও নিবিড় করে তুলছে। সবার সাথে সবার তথ্য ও সুখ-দুঃখ শেয়ার করছে। এসব সামাজিক নেটওয়ার্কের মধ্যে ‘ফেসবুক’ বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় সোশ্যাল নেটওয়ার্ক।

এভাবে বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবহৃত ইন্টারনেট মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তির অপার সমুদ্রে অবগাহন করার অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ক্ষুদ্র & দরিদ্র জনবহুল দেশ হয়েও তথ্যপ্রযুক্তির দিক থেকে বাংলাদেশ পিছয়ে নেই। বিশ্বের বড় বড় দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে দেশটি প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এগিয়ে চলছে। (ইন্টারনেট রচনা)

ইন্টারনেট ব্যবহারের নেতিবাচক দিক 

ইন্টারনেট যেমন মানুষের জীবনে অসংখ্য সুযোগ-সুবিধা এনেছে, তেমনি কিছু নেতিবাচক দিকও সামনে এসেছে। অনেক সময় ভুয়া বা মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিবিদ্বেষ উস্কে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সাইবার অপরাধ এখন এক মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে মিথ্যা ও ভুয়া সংবাদ ছড়ানো হচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়াও, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভুয়া নোট, ভুল তথ্য ইত্যাদি ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটাচ্ছে কিছু ইন্টারনেটভিত্তিক কর্মকাণ্ড, যেমন—প*র্নোগ্রাফি, জুয়া, ব্ল্যাকমেইলিং ইত্যাদির প্রসার। অনেক সময় বিভিন্ন সংস্থা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাইরাস ছড়িয়ে লক্ষ লক্ষ কম্পিউটার নষ্ট করে দিচ্ছে। এমনকি ঘরে বসে ইন্টারনেট ব্যবহার করে কোথাও কোথাও বোমা বিস্ফোরণের মতো ঘটনাও ঘটানো হচ্ছে। এইসব নেতিবাচক ব্যবহারের জন্য প্রযুক্তি নয়, বরং দায়ী এর অপব্যবহারকারী। প্রযুক্তি নিজে অপরাধী নয়—এটি কিভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়। তাই ইন্টারনেটকে যদি ইতিবাচকভাবে ও সঠিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায়, তবে এটি মানবকল্যাণে আরও বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

উপসংহার

আধুনিক জীবন ও বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত থেকে ইন্টারনেট মানুষের জন্য যে বিস্ময় বয়ে এনেছে তা থেকেই বয়ে আনতে হবে কল্যাণ ও সমৃদ্ধি। যে দেশে কম্পিউটার ব্যবহার করা হবে সে দেশের বাস্তব অবস্থা স্বীকার করেই তার প্রয়োগক্ষেত্র নির্বাচন করতে হবে। এর মধ্য দিয়েই খুঁজে পেতে হবে ইন্টারনেট ব্যবহারের সর্বোচ্চ উপকারী দিক। আর পরিহার করতে হবে সাইবার অপরাধের মতো সমস্ত অপকৌশল ও অপব্যবহার। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন মিথ্যা তথ্য সরবরাহ ও প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে। নৈতিক অবক্ষয় সাধিত হয় এমন সব কর্মকাণ্ডকে ঘৃণা করতে হবে। এক কথায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে মানুষের সার্বিক কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থ বা খেয়ালে ব্যবহার করা যাবে না।

ইন্টারনেট রচনা ২

ভূমিকা : মানবসভ্যতার বিস্ময়কর বিকাশে বিজ্ঞান যে অনন্য ভূমিকা পালন করছে তার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ইন্টারনেট। বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী একটি ব্যবস্থার নাম ইন্টারনেট। ইন্টারনেট কম্পিউটার বাহিত এমন একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা যার মাধ্যমে বিশ্বের দেশগুলো আজ পরস্পর ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ‘বিশ্বায়ন’ ধারণায় তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই ইন্টারনেট। জীবনের ব্যাপক ও বহুমুখী কাজে এখন ইন্টারনেট ব্যবহৃত হয়ে আধুনিক ইলেক্ট্রনিক্স প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে বিপুলভাবে সম্ভাবনাময় করে তুলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় তথ্যবিপ্লবেও রয়েছে ইন্টারনেটের গুরুত্বপূর্ণ ও সফল অবদান।

তথ্যবিপ্লব ও তথ্যপ্রযুক্তি : তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার এ যুগে খুব জোর দিয়েই বলা যায়, ‘Information is power.’ জ্ঞান আহরণের পাশাপাশি তথ্যসমৃদ্ধ হওয়া শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্প বিপ্লবের পর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন পৃথিবীতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তথ্যপ্রযুক্তি দূরকে এনেছে চোখের সামনে, পরকে করেছে আপন, আর অসাধ্যকে সাধন করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার ও চর্চা এখন শুধু হাতে গোনা দু-একটি উন্নত দেশের আভিজাত্যের বিষয় নয়, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

ইন্টারনেট কি : ইন্টারনেট কথাটি ইন্টারকানেক্টেড নেটওয়ার্ক এর সংক্ষিপ্ত রূপ। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে ইন্টারনেটের উদ্ভব। কম্পিউটার নেটওয়ার্কের একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠেছে এ প্রক্রিয়া। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত কম্পিউটারকে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে যুক্ত করে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তাই হলো ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের সাথে অন্যান্য কম্পিউটার সংযুক্ত রয়েছে এ পদ্ধতিতে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন কম্পিউটার থেকে যে কোনো কম্পিউটারে ছবিসহ যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণ করা যায়। ইন্টারনেট চালানোর জন্য সাধারণত তিনটি জিনিস প্রয়োজন, এগুলো হলো : কম্পিউটার, মডেম এবং ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার।

ইন্টারনেটের সম্প্রসারণ : আমেরিকার প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ চারটি কম্পিউটারের মাধ্যমে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করেছিল তার নাম ছিল ‘আর্পানেট’। পরবর্তী তিন বছরে কম্পিউটারের সংখ্যা বেড়ে ছত্রিশে দাঁড়ায়। চাহিদা বাড়ার ফলে ১৯৮৪ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল সাইন্স-ফাউন্ডেশন সর্বসাধারণের জন্য ‘নেস্ফেনেট’ নামে একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করে। তিন বছরের মধ্যে এ ব্যবস্থা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এটি তখন গবেষণা কাজে তথ্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ ছিল। এর সঙ্গে অনেক ছোট বড় নেটওয়ার্ক যুক্ত হয়ে সমস্যার সৃষ্টি করে। সমগ্র ব্যবস্থাটি নিয়ন্ত্রণের জন্য ’৯০-এর দশকের শুরুতে কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক হিসেবে ইন্টারনেট গড়ে তোলা হয়। ১৯৯৩ সালে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য ইন্টারনেটকে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। অল্পদিনের মধ্যে ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হয় লাখ লাখ সদস্য। এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত সারাবিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

ইন্টারনেটের প্রকারভেদ : ইন্টারনেট প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত কতকগুলো পদ্ধতি রয়েছে সেগুলো নিচে দেয়া হলো :

১. ই-মেইল : ই-মেইলের মাধ্যমে যে কোনো সংবাদ পাঠানো যায়। এ প্রক্রিয়ায় খুব দ্রুত অর্থাৎ ফ্যাক্স-এর দশভাগের একভাগেরও কম সময় এবং কম খরচে তথ্যাদি পাঠানো যায়।
২. ওয়েব : ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত কম্পিউটারগুলোতে যে তথ্য রাখা হয়েছে সেগুলো ব্যবহার করার ব্যবস্থা বা পদ্ধতিকে ওয়েব বলে।
৩. নেট নিউজ : উন্টারনেটের তথ্যভাণ্ডারের সংরক্ষিত সংবাদ যে কোনো সময় এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উন্মুক্ত করা যায়।
৪. চ্যাট : এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তির সাথে একই সময়ে কথা বলা যায় বা আড্ডা দেয়া যায়।
৫. আর্কি : আর্কির কাজ হলো তথ্যসমূহকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সূচি আকারে উপস্থাপন করা।
৬. ইউজনেট : অনেকগুলো সার্ভারের নিজস্ব সংবাদ নিয়ে গঠিত তথ্যভাণ্ডার, যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।
৭. গোফার : তথ্য খুঁজে দেয়ার একটি পদ্ধতি, যার সাহায্যে গুরুত্বানুযায়ী তথ্যের সমন্বয় সাধিত হয়।
৮. ই-ক্যাশ : ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ই-ক্যাশ পদ্ধতি বলে। আসলে ই-ক্যাশ অনেকগুলো আধুনিক অর্থনৈতিক লেনদেনের সমষ্টি।

বাংলাদেশের ইন্টারনেট : বাংলাদেশে ইন্টারনেট চালু হয় ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। তখন এর ব্যবহার ছিল সীমিত এবং কেবল ই-মেইলে তার প্রয়োগ ছিল। ১৯৯৬ সালের ১৫ জুন থেকে অনলাইন সংযোগ দেয়া শুরু হলে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির বিশাল জগতে প্রবেশ করে। ২০০০ সালের শুরুতে এর ৬০ হাজার সংযোগ দেয়া হয়েছিল। বর্তমানে তা ক্রমাগত বাড়ছে। ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশে ফাইবার অপটিক কেবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ বড় শহরগুলোকে সংযুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়। ঢাকার মগবাজার ও গুলশানের টেলিফোন এক্সচেঞ্জের মধ্যে প্রথম ফাইবার অপটিক সংযোগ স্থাপন করা হয়। বর্তমানে শহরগুলোতে আন্তঃএক্সচেঞ্জগুলোর মধ্যে ফাইবার অপটিক সংযোগ আছে।

তথ্যবিপ্লবে ইন্টারনেট : তথ্য বিপ্লবের যুগে ইন্টারনেট এক অভাবনীয় পরিবর্তন এনে দিয়েছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে তথ্য পাঠানো বা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। লেখাপড়া, শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এটি একটি অপরিহার্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে, যা আগে সবসময় সহজলভ্য ছিল না। এখন ঘরে বসেই বিশ্বের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা যায়। ভ্রমণপ্রেমীদের জন্যও ইন্টারনেট একটি নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। এটি ভ্রমণ স্থানের আবহাওয়ার খবর, হোটেল বুকিং, গাড়ি ভাড়া বা বিমান টিকিট সংরক্ষণের সুবিধা সহজ করে দিয়েছে। চিকিৎসা সেবাতেও ইন্টারনেট এনেছে বিপ্লব। বিশ্বখ্যাত চিকিৎসকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যার ফলে ঘরে বসেই উন্নত চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব। আইনি পরামর্শের ক্ষেত্রেও ইন্টারনেট অত্যন্ত কার্যকর। প্রয়োজনীয় আইনজীবী বা আইন সংস্থার তথ্য এখন খুব সহজেই ঘরে বসে পাওয়া যায়। এতে সময়, অর্থ ও শ্রম—সবকিছুরই সাশ্রয় হয়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো দেশের রাজনৈতিক অবস্থা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি জানা যায়। বিনোদনের ক্ষেত্রেও এর অবদান অনন্য—গান শোনা, সিনেমা দেখা, খেলা উপভোগ করা সবই এখন ঘরে বসেই সম্ভব। এমনকি দৈনিক পত্রিকার খবর, শেয়ার বাজারের ওঠানামা এবং সাধারণ বাজারদরের তথ্যও সহজেই ইন্টারনেট থেকে জানা যায়।

বাংলাদেশের অবস্থান : তথ্যপ্রযুক্তি যে বাংলাদেশের জন্যও সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি, এ কথা আজ সবাই উপলদ্ধি করছে। তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপারে খুবই আগ্রহ প্রকাশ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, ইপিবি, বিসিসি, বিসিএস, নন রেসিডেন্ট বাংলাদেশীদের সংগঠন ‘টেকবাংলা’ প্রভৃতি সংগঠন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ গত দশ বছরে এগিয়েছে। সম্প্রতি সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক তথ্য প্রবাহের সাম্রাজ্য ইন্টারনেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তির উন্ননে করণীয় : বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর সাথে উন্নত দেশগুলোর এক ধরনের বৈষম্য আলোচিত হচ্ছে। ইংরেজিতে একে বলা হচ্ছে Digital Divide, বাংলায় ডিজিটাল বৈষম্য। তাই একবিংশ শতাব্দীর এ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হবে যোগ্যতা দিয়ে এবং তথ্যপ্রযুক্তির নবতর কৌশল আয়ত্তে এনে। এজন্য নিম্নলিখিত কর্মসূচি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

১. বিশ্বায়নের এ যুগে টিকে থাকতে হলে আমাদের দেশের তরুণ সমাজকে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।
২. যেহেতু বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ লোক গ্রামে বাস করে, সেহেতু বিশাল সংখ্যক গ্রামবাসীকে শিক্ষিত, সচেতন ও তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞানে দক্ষ করে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ইন্টারনেটের প্রসার ঘটাতে হবে।
৩. বিশ্বব্যাপী চলমান তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের অংশীদার হওয়ার জন্য জাতীয় তথ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
৪. তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষ সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

উপসংহার : তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিই বর্তমান বিশ্বের সকল প্রকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূল হাতিয়ার। তথ্যপ্রযুক্তির দিক থেকে যারা যত বেশি অগ্রগামী, তারা তত বেশি উন্নত। বিজ্ঞানের বিপুল অগ্রগতির ফসল ইন্টারনেট এখন পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে গ্রহান্তের কর্মকাণ্ডে নিজের স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের দেশের মতো আমরাও পিছিয়ে আছি। তাই আমাদের উচিত ইন্টারনেটের ব্যাপক ও বহুমাত্রিক প্রসার ঘটিয়ে দেশকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার উপযোগী করে গড়ে তোলা।

ইন্টারনেট রচনা ৩

ভূমিকা : ইন্টারনেট কম্পিউটার বাহিত এমনই এক সংযোগ ব্যবস্থা যার মাধ্যমে আক্ষরিক অর্থে সারা বিশ্বেই চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। এর সাহায়্যে মানুষ উন্নীত হয়েছে এমন এক স্তরে যেখানে সারা বিশ্বের সকল ইন্টানেট ব্যবহারকারী একটি সমাজে পরিণত হয়েছে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে এর মাধ্যমে। সাথে সাথে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ক্ষেত্রে এসেছে এক অভাবনীয় সাফল্য।

ইন্টারনেট কী? : ইন্টারনেট হচ্ছে কম্পিউটার নেটওয়ার্কসমুহের একটি বিশ্ব ব্যবস্থা। এটি এমন একটি নেটওয়ার্ক বা জাল বিস্তার যার সাথে অনেক ক্ষুদ্র কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সংযোগ আছে। প্রতিটি শহরে মহাসড়কের সাথে যেমন অন্যান্য রাস্তা, গলি ও উপগলির যোগাযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি ইন্টানেট নামক নেটওয়ার্কের সাথে অন্যান্য ক্ষুদ্র কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সংযুক্ত। এদিক দিয়ে একে নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক বলা যায়। ইন্টানেটের মাধ্যমে পৃথিবীর এক প্রান্তের কম্পিউটার থেকে অন্য প্রান্তের আর একটি কম্পিউটারে ছবিসহ যাবতীয় তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও প্রেরণ করা যায়। ইন্টারনেট একটি বিশাল ‘নেটওয়ার্কিং সিস্টেম’ যার বিস্তৃতি পৃথিবীময়। বিশ্বের লাখ লাখ বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসহ কোটি কোটি লোকের ব্যক্তিগত কম্পিউটারের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে ইন্টারনেট।

ইন্টারনেটের উদ্ভব ও অগ্রগতি : ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর প্রথমবারের মতো ইন্টারনেট ব্যবহারের সূচনা করে। মাত্র চারটি কম্পিউটারের মাধ্যমে তাদের কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা একটি নতুন অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘ডার্পানেট’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থায় যুক্ত কম্পিউটারের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং তিন বছরের মধ্যেই তা ৪ থেকে বেড়ে ৩৩-এ পৌঁছে যায়। ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফলে ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন সাধারণ মানুষের জন্য ‘নেস্ফেনেট’ নামে আরেকটি নতুন নেটওয়ার্ক চালু করে। শুরুতে এটি গবেষণার কাজে তথ্য বিনিময়ের জন্য ব্যবহৃত হতো। মাত্র তিন বছরের মধ্যেই নেস্ফেনেট সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন ছোট-বড় নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। এতে কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, যা সামাল দিতে প্রয়োজন পড়ে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা। সেই প্রয়োজন পূরণে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে ‘ইন্টারনেট’ ধারণার জন্ম হয়। ১৯৯৩ সালে ইন্টারনেটকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং কিছু দিনের মধ্যেই লক্ষাধিক নতুন ব্যবহারকারী এতে যুক্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বের কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে বিশ হাজারেরও বেশি নেটওয়ার্ক সংযুক্ত এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যা তিন কোটিরও বেশি, যা প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এভাবেই ইন্টারনেট ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীকে একটি জালের মতো জড়িয়ে ফেলেছে।

ইটারনেটের প্রকারভেদ : ব্যবহারকারীরা দুভাবে ইন্টারনেটের গ্রাহক হতে পারে। প্রথমটি হলো অন-লাইন ইন্টারনেট। টেলিফোন লাইনের মাধ্যমে সরাসিরি কম্পিউটারে ইন্টারনেটের অন্য যেকোনো সার্ভিস প্রভাইডারের সঙ্গে যুক্ত করার পদ্ধতিকে অন-লাইন ইন্টারনেট বলা হয়। তাতে ব্যবহারকারীরা যেকোনো সময় অন্য যেকোনো প্রভাইডারের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে। এছাড়াও IP Access পদ্ধতিতে সরাসরি অন-লাইন ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া যায়। কিন্তু  এ পদ্ধতি ব্যয়বহুল হওযায় সাধারণ গ্রাহক তাতে আগ্রহবোধ করে না।
দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো অফ-লাইন ইন্টারনেট যা ই-মেইল নামে পরিচিত। এ প্রক্রিয়ায় গ্রহকরা নিকটবর্তী কোনো সার্ভারকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে বলেই এটাকে অফ-লাইন ইন্টারনেট বা ই-মেইল বলা হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিতে গ্রহকরা কম খরচে অফ-লাইন বা ই-মেইল ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।

ইন্টারনেট ব্যবহারের পদ্ধতি : ইন্টারনেটের ব্যবহার পদ্ধতি বিভিন্ন রকম। যেমন-
ক. ওয়েব : ওয়েব হচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত কম্পিউটারগুলোতে যে তথ্য রাখা হয়েছে সেগুলো ব্যবহারের পদ্ধতি।
খ. চ্যাট : চ্যাটের সাহায্যে একই সময়ে একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলা যায়।
গ. ই-মেইল : এ পদ্ধতি হচ্ছে সংবাদ আদান-প্রদানের এক সহজ ব্যবস্থা। এ পদ্ধতিতে অতিদ্রুত তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব।
ঘ. নেট নিউজ : এ পদ্ধতিতে ইন্টারনেট সংরক্ষিত সংবাদ যেকোনো সময় উন্মুক্ত করা যায়।
ঙ. ই-ক্যাশ : ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ই-ক্যাশ পদ্ধতি বলে।
চ. আর্কি : আর্কি হচ্ছে নেটওয়ার্কে তথ্য সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে স্থাপিত একটি পদ্ধতি, যা তথ্যগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সূচি আকারে সমন্বয় করে উপস্থাপন করতে সক্ষম।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট : ১৯৯৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর বাংলাদেশে ইন্টানেটের ব্যবহার শুরু হয়। শুরুর দিকে ইন্টারনেট অফলাইনের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা ছাড়াও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মেইল সার্ভিস দিয়ে আসছিল। কিন্তু অফলাইনে সংযুক্ত থাকার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশাল জগতের সকল সম্পদ ব্যবহার করা সম্ভব হতো না। ই-মেইলের কেবল ডাুনলো (তথ্য গ্রহণ) ও আপলোড (তথ্য প্রেরণ) করা যেত। কিন্তু ১৯৯৬ সালের ১৫ই জুলাই থেকে বাংলাদেশে অনলাইন ইন্টানেট সেবা প্রদান শুরু হয়। বাংলাদেশ ইনফরমেশন সুপার হাইওয়েতে অর্থাৎ তথ্য প্রযুক্তির এক বিশাল জগতে প্রবেশ করে। এর ফলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার। ২০০০ সালের শুরুতে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৬০ হাজারে। ধারণা করা যাচ্ছে, এই সংখ্যা ২০০২ সালে আনুমানিক ১ লাখের বেশি। ২০১৭ সালের শুরুতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ কোটি ৭০ লক্ষের অধিকে।

ইন্টারনেটের সুবিধা : ইন্টারনেটের ব্যবহার মানুষের জীবনে এনেছে বিপুল পরিবর্তন। এই যোগাযোগ নেটওয়ার্ক আজ অসম্ভবকে করেছে সম্ভব। এর সাহায্যে পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তে যে-কোনো সময়ে তথ্য বা খবর প্রেরণ করা যায় এবং সেখান থেকে নতুন তথ্য পাওয়া সম্ভব। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, বিনোদন, বিপণন ইত্যাদি সবক্ষেত্রেই ইন্টানেটের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। এর দ্বারা কোনো দেশের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অন্য দেশের লোক সহজেই জানতে পারছে। কোনো দেশের শেয়ার বাজারের অবস্থা ও দেশের জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থাও অন্য দেশের লোকের মাধ্যমে সহজেই জেনে নিতে পারছে। ইন্টারনেটের সাহায্যে বিশ্বের যে-কোনো প্রান্ত হতে যে কেউ প্রবেশ করতে পারছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরিতে, সেখানকার বিভিন্ন বই থেকে তথ্যও সংগ্রহ করতে পারছে। বর্তামানে দূরশিক্ষণে ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোনো ছাত্র শিক্ষকের কাছ থেকে পড়া বুঝে নিতে পারে। বিনোদনের ক্ষেত্রেও ইন্টারনেট ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের একজন লোকের পক্ষে ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিউইয়র্কের কোনো ওপেন এয়ার কনসার্ট উপভোগ করা সম্ভব হচ্ছে ইন্টানেট ব্যবহার করে বাংলাদেশের একজন রোগী বিদেশের ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারছে। বর্তমানে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেশে বসে অন্য দেশের জিনিসপত্র কোকাটা করাও সম্ভব হচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন ধরণের খেলা, গান শোনা, সিনেমা দেখা, রান্না শেখা, ফ্যাশন সম্পর্কে জানা এমন কি বিয়ের সম্পর্কও প্রতিষ্ঠা করা যায় ইন্টানেটের মাধ্যমে।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে আজ চাকরির জন্য ঘুরতে হয় না। ঘরে বসে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করা যায়। আবার কেউ কেউ ইন্টারনেটে কাজ করে আত্মনির্ভরশীল হচ্ছে। কেউ আবার অনলাইনে ঘরে বসে বিদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন এবং মাস শেষে বেতনও পাচ্ছেন অনলাইনে।
ইন্টানেটের সুভিধাগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো : (১) ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব, (২) ই-মেইল, (৩) নিউজগ্রুপ, (৪) টেলনেট (৫) গোফার ও (৬) ফাইল ট্রান্সফার। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব দ্বারা অন্যান্য কম্পিউটারের তথ্যাদি পড়া ও শোনা যায়। ই-মেইল দ্বারা অন্য কম্পিউটারের সাথে থথ্য আদান-প্রদান করা যায়। ইন্টানেটে প্রকাশিত প্রতিদিনের পত্রিকার পাঠক হওয়া যায় নিউজগ্রুপের মাধ্যমে। টেলনেটের মাধ্যমে সরাসরি কম্পিউটারে টাইপ করে অন্য ইন্টানেট ব্যবহারকারীর সাথে থথ্য বিনিময় করা যায়। আর ফাইল ট্রান্সফারের মাধ্যমে এক কম্পিউটার হতে অন্য কম্পিউটারে ফাইল আদান-প্রদান ও ফাইল সংরক্ষণ করা যায়। এক কথায় ইন্টানেট বিশ্বের তথ্য সমুদ্র থেকে মণিমুক্তা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ডুবুরির কাজ করে। ইন্টারনেটের এই বহুবিধ ব্যবহারের কারণেই বিশ্ববাসী আজ প্রতিনিয়ত ইন্টারনেটের দ্বারস্থ হচ্ছে।

ইন্টারনেটের অসুবিধা : সব কিছুরই যেমন ভাল ও খারাপ দিক আছে তেমনি ইন্টারনেটও এর ব্যতিক্রম নয়। ইন্টরনেটের মাধ্যমে কিছু ব্যবহারকারী বা ভোক্তা মিথ্যা তথ্য প্রদান, প*র্নোগ্রাফিক চিত্র আদান-প্রদান, কিংবা জুয়া খেলার মতো অনুচিত কাজে লিপ্ত হচ্ছে। কেউ কেউ কম্পিউটার ভাইরাস তৈরি করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে বিশ্বের লাখ লাখ কম্পিউটার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ১৯৮৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ‘ইন্টারনেট ওয়ার্ম’ নামক ভাইরাস প্রবেশ করিয়ে কয়েক হাজার কম্পিউটার ক্ষতিগ্রস্ত করে। ‘চেরানাবিল ভইরাস’ নামক একটি ভাইরাস বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে আক্রমণ চালিয়ে সারা বিশ্বের লাখ লাখ কম্পিউটার অকেজো করে দেয়। সম্প্রতি ‘লাভবাগ’ নামক একটি ভাইরাসও বিপুল ক্ষতি সাধন করেছে। ভাইরাস হলে একপ্রকার কম্পিউটার প্রোগ্রাম যা অন্য কম্পিউটারের স্মৃতি ধ্বংস করতে সক্ষম। এছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের তের বছর বয়সী তিনজন ছাত্র তাদের স্কুলে ফিট্ করে রাখা বোমা ফাটায়। ইন্টারনেট হ্যাকাররা ইন্টারনেটের মাধ্যমে অন্য কম্পিউটারের সকল তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এর ফলে অনেক গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। কিছু দিন আগে ‘ব্লু হোয়েল’ নামক ইন্টারনেটে অনলাইন ভিত্তিক একটি খেলা সারা বিশ্বের কয়েক লাখ শিশু-কিশোরকে আত্মহত্যায় বাধ্য করে।

অর্থাৎ ইন্টারনেটের সাহায্যে বিশ্বের মানুষ যেমন উপকৃত হচ্ছে তেমনি বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতিও হচ্ছে। তবে এজন্যে ইন্টারনেট পদ্ধতিকে দোষ দেওয়া যায় না। বরং এর সুষ্ঠ ববহাররের জন্যে বিশ্ববাসীকেই সচেতন হতে হবে।

ইন্টারনেট সংযুক্তিকরণ : ইন্টারনেট সংযুক্তিকরণের জন্যে সবপ্রথমে প্রয়োজন একটি কম্পিউটার বা মুঠোফোন। কম্পিউটারের ক্ষেত্রে লাগবে একটি মডেম। আর লাগবে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ইন্টারনেট সংযোগ। মুঠোফোন ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট দামে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইন্টারনেট ক্রয় করতে হয় তার নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। তবে সবার আগে ব্যবহারকারীকে ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

উপসংহার : ইন্টারনেট বিজ্ঞানের জয়যাত্রার সংযোজন করেছে নতুন মাত্রা। ইন্টারনেট আজ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে। এর মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রা অনেক সহজ হয়ে আসছে। সারা বিশ্বের সকল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী যদি ইন্টারনেটের অপকারিতা বন্ধের লক্ষ্যে একত্রে কাজ করেন তাহলেই ইন্টারনেট মানব জীবনে আরও অগ্রগতি এনে দিতে সক্ষম হবে। আগামী দিনে হয়তো এই ইন্টারনেট ব্যবস্থাই পৃথিবীর সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করবে।

এই ছিল ইন্টারনেট রচনা। যদি আপনি আরও সুন্দর ও সহজ ভাষার রচনা পড়তে চান, তাহলে ভিজিট করুন StudyTika.com। এখানে আরও অনেক দরকারি রচনা পাবেন।

Getting Info...

إرسال تعليق

Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.