গীতিকার কাকে বলে? (সহজ সংজ্ঞা) | গীতিকার পরিচয় | বিভিন্ন পণ্ডিতের মতে গীতিকার সংজ্ঞা | গীতিকার বৈশিষ্ট্য | গীতিকার শ্রেণীবিভাগ

বাংলা সাহিত্যের অনেক সুন্দর বিষয়ের মধ্যে গীতিকা বা ব্যালাড একটি বিশেষ অংশ। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীই গীতিকা সম্পর্কে সহজভাবে বুঝতে পারে না। আসলে গীতিকা শুধু একটি সাহিত্য বিষয় নয়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গ্রামের মানুষের জীবন, আবেগ, সুখ-দুঃখ আর পুরনো বাংলার সংস্কৃতির গল্প।

এই পোস্টে আমরা খুব সহজ ভাষায় জানবো গীতিকা কাকে বলে, এর বৈশিষ্ট্য কী, কত প্রকার ও কেন বাংলা সাহিত্যে গীতিকার গুরুত্ব এত বেশি। তাই আপনি যদি পরীক্ষার জন্য সহজ নোট খুঁজে থাকেন বা সহজভাবে পুরো বিষয়টি বুঝতে চান, তাহলে এই পোস্টটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন। আশা করি খুব সহজেই সবকিছু বুঝতে পারবেন।

গীতিকার কাকে বলে?(সহজ সংজ্ঞা)

গীতিকা বা ব্যালাড কাকে বলে?

গীতিকা বা ব্যালাড হলো এমন এক ধরনের লোকসাহিত্য, যেখানে গান ও গল্প একসাথে মিলেমিশে থাকে। সহজ ভাষায় বলা যায়, সুরের মাধ্যমে কোনো কাহিনী প্রকাশ করাকেই গীতিকা বলা হয়। এগুলো সাধারণত লোকমুখে প্রচলিত ছিল এবং গ্রামবাংলার মানুষ গান আকারে এগুলো পরিবেশন করত।

ইংরেজি Ballad শব্দের বাংলা অর্থ হলো গীতিকা। এই শব্দটি এসেছে লাতিন Ballare শব্দ থেকে। Ballare শব্দের অর্থ হলো নৃত্য। তাই বোঝা যায়, গীতিকার সঙ্গে শুরু থেকেই গান ও নাচের সম্পর্ক ছিল।

গীতিকার পরিচয়

গীতিকা বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে গীতিকাগুলো খুব বেশি জনপ্রিয় ছিল। দীর্ঘদিন ধরে এগুলো সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল।

১৮৭৮ সালে স্যার জর্জ গ্রীয়ারসন এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে ‘মানিকচন্দ্র রাজার গান’ প্রকাশ করেন। এর ফলে শিক্ষিত সমাজে গীতিকার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। পরে দীনেশচন্দ্র সেন, চন্দ্রকুমার দে এবং কেদারনাথ মজুমদার পূর্ববঙ্গ থেকে বিভিন্ন গীতিকা সংগ্রহ করেন। এর মাধ্যমে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ প্রকাশিত হয়।

গীতিকার স্বরূপ

গীতিকা একদিকে কবিতা, অন্যদিকে লোকগান। এতে গল্প, সুর এবং আবেগ একসাথে প্রকাশ পায়। গীতিকায় সাধারণ মানুষের জীবন, প্রেম, দুঃখ, সুখ ও সংগ্রামের কথা সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়।

গীতিকা মূলত কাহিনীমূলক গান। এখানে গল্পের সাথে সুরের সুন্দর মিল থাকে। এই কারণেই বাংলা গীতিকার সঙ্গে পাশ্চাত্যের ব্যালাডের মিল দেখা যায়।

বিভিন্ন পণ্ডিতের মতে গীতিকার সংজ্ঞা

১। গল্পভিত্তিক গান

ড. সুর হেলেন চাইল্ড বিটরেজ গ্লিসের মতে, সঙ্গীতের মাধ্যমে যে গল্প বলা হয় তাকে গীতিকা বলা হয়।

২। ছোট ছোট স্তবকে গঠিত কাহিনী

গীতিকা হলো সহজ ভাষায় লেখা ছোট ছোট স্তবকের কাহিনীভিত্তিক কবিতা।

৩। নাটকীয় কাহিনী

একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা কাহিনীকে নাটকীয়ভাবে প্রকাশ করা গীতিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

৪। সহজ সুরে গাওয়া কাহিনী

গীতিকাগুলো সাধারণত সহজ ছন্দ ও সহজ সুরে গাওয়া হয়।

গীতিকার বৈশিষ্ট্য

১। সংক্ষিপ্ত ও দ্রুতগতি সম্পন্ন

গীতিকা সাধারণত ছোট আকারের হয়। এর কাহিনী দ্রুত এগিয়ে যায় এবং অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা থাকে না।

২। সহজ ও সরল ভাষা

গীতিকায় খুব সহজ ভাষা ব্যবহার করা হয়। কারণ এগুলো সাধারণ মানুষের জন্য রচিত।

৩। লোকজ জীবনচিত্র

গীতিকায় গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন, প্রেম, দুঃখ, আনন্দ ও সামাজিক ঘটনা তুলে ধরা হয়।

৪। নৈর্ব্যক্তিকতা

গীতিকায় ব্যক্তিগত ভাব কম থাকে। এখানে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়।

৫। একক কাহিনী

গীতিকায় সাধারণত একটি মূল ঘটনা বা কাহিনীকে কেন্দ্র করে রচনা করা হয়।

৬। গাওয়ার উপযোগিতা

গীতিকা মূলত গাওয়ার জন্যই রচিত। এগুলো পরিবেশনের সময় বেহালা, সারিন্দা, দোতারা, ঢাক, ঢোল, সানাই ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হতো।

৭। পুনরুক্তি বা ধুয়া

গীতিকায় কোনো শব্দ বা লাইন বারবার ব্যবহার করা হয়। একে ইংরেজিতে Refrain বলা হয়। বাংলায় একে ধুয়া বা ধ্রুপদ বলা হয়।

৮। ছন্দ ও অলংকারের ব্যবহার

গীতিকায় সুন্দর ছন্দ ও অলংকার ব্যবহার করা হয়। একই শব্দ বারবার ব্যবহারের মাধ্যমে সুর ও সৌন্দর্য সৃষ্টি করা হয়।

গীতিকার শ্রেণীবিভাগ

বাংলা গীতিকাগুলো সাধারণত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। যেমন —

  • নাথ গীতিকা
  • মৈমনসিংহ গীতিকা
  • পূর্ববঙ্গ গীতিকা

ড. বহ্নিকুমার ভট্টাচার্যের মতে গীতিকার প্রকারভেদ

ড. বহ্নিকুমার ভট্টাচার্য বাংলা গীতিকাকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেছেন।

আবার অধ্যাপক বরুণ চক্রবর্তী তাঁর ‘গীতিকাস্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য’ গ্রন্থে গীতিকাকে তেরোটি ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন —

  • অলৌকিক কাহিনীকেন্দ্রিক গীতিকা
  • ধর্মীয় গীতিকা
  • রোমান্টিক বিয়োগান্তক গীতিকা
  • প্রেমকেন্দ্রিক গীতিকা
  • রাখালী গীতিকা
  • গৃহবিবাদ সংক্রান্ত গীতিকা
  • ঐতিহাসিক গীতিকা
  • অর্ধ ঐতিহাসিক গীতিকা
  • অপমৃত্যু ও বিপদ বিষয়ক গীতিকা
  • চর্যাধর্মী গীতিকা
  • আঞ্চলিক গীতিকা
  • লোকনায়ক বিষয়ক গীতিকা
  • ধাঁধাকেন্দ্রিক ও হাসির কাহিনীর গীতিকা

নাথগীতিকা

নাথ সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে রচিত গীতিকাকে নাথগীতিকা বলা হয়। এর দুটি প্রধান বিষয় ছিল —

  • নাথগুরুদের অলৌকিক সাধনা
  • রাজপুত্র গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস জীবন

এই ধারার উল্লেখযোগ্য গীতিকা হলো —

  • গোরক্ষ-বিজয়
  • মীনচেতন
  • মানিকচন্দ্র রাজার গান
  • গোবিন্দ চন্দ্রের গীত
  • ময়নামতীর গান
  • গোপীচাঁদের সন্ন্যাস
  • গোপীচাঁদের পাঁচালী

নাথগীতিকা প্রধানত উত্তরবঙ্গে জনপ্রিয় ছিল। সেখানে এটি ‘যুগীযাত্রা’ নামে পরিচিত ছিল।

মৈমনসিংহ গীতিকা

মৈমনসিংহ গীতিকার মূল বিষয় হলো প্রেম ও মানুষের জীবন। যখন বাংলা সাহিত্যে ধর্মভিত্তিক কাব্যের প্রচলন ছিল, তখন মৈমনসিংহ গীতিকা সাধারণ মানুষের জীবন ও আবেগকে তুলে ধরে নতুন ধারা সৃষ্টি করে।

এই গীতিকাগুলো ময়মনসিংহ জেলার কৃষকদের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। চন্দ্রকুমার দে এগুলো সংগ্রহ করেন এবং দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদনা করেন। পরে ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ নামে প্রকাশিত হয়।

পূর্ববঙ্গ গীতিকা

বাংলা গীতিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো পূর্ববঙ্গ গীতিকা। ত্রিপুরা, নোয়াখালি, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামসহ পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই গীতিকাগুলো সংগ্রহ করা হয়।

দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় এগুলো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ নামে প্রকাশিত হয়। পরে এগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে Eastern Bengali Ballads of Mymensingh নামে প্রকাশিত হয়।

উপসংহার

গীতিকা বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সম্পদ। এতে গ্রামবাংলার মানুষের জীবন, প্রেম, দুঃখ, আনন্দ ও সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। সহজ ভাষা, সুর ও কাহিনীর কারণে গীতিকা আজও মানুষের কাছে জনপ্রিয়। বাংলা সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি বুঝতে গীতিকার গুরুত্ব অনেক বেশি।

গীতিকা বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে আমরা বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন, প্রেম, আবেগ ও সমাজের অনেক বাস্তব চিত্র জানতে পারি। সহজ ভাষা ও সুন্দর কাহিনীর কারণে গীতিকা আজও সবার কাছে জনপ্রিয়।

আশা করি এই পোস্টটি পড়ে গীতিকা বা ব্যালাড সম্পর্কে আপনার ধারণা আরও সহজ ও পরিষ্কার হয়েছে। এমন আরও সহজ ও সুন্দর শিক্ষামূলক পোস্ট পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন StudyTika.com। এখানে সকল বিষয় খুব সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয় যাতে সব শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সহজে বুঝতে পারে।

Getting Info...

إرسال تعليق

Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.